বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় রোগটি প্রতিরোধে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। ৬ অক্টোবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরনই ছড়িয়ে পড়ায় সম্ভাব্য টিকা পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো কোনো ট্রায়াল শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির ঘোষণা আসেনি।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, দেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরনই শনাক্ত হয়েছে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, সব ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশে টিকার পরীক্ষা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ রোগটির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশ হতে পারে। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন নিতে হবে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেন উদ্বেগজনক

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৩৫০ জনের বেশি। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৮১ জনের। শুধু অক্টোবরের প্রথম ছয় দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ৭৩৬ জন এবং মারা গেছেন ৩৬ জন।

সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ার পেছনে এটি একটি উদ্বেগজনক বিষয়। একই সময়ে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন হলো ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর তৈরি হওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য তিন ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না। ফলে একজন ব্যক্তি জীবনে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। পরবর্তী সংক্রমণের ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকিও থাকতে পারে।

টিকা নিয়ে সরকারের অবস্থান

ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়টি নিয়ে সরকারের আলোচনা নতুন নয়। ১ অক্টোবর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ ও গ্যাভির সঙ্গে আলোচনা চলছে। টিকা ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

এরপর ৬ অক্টোবর স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে আসে। তবে টিকা নিয়ে আলোচনা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জন্য টিকাদান কর্মসূচি চালু করা—এগুলো আলাদা ধাপ। তাই ট্রায়ালের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াকে টিকা শিগগিরই বাজারে আসার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিউডেঙ্গা (TAK-003) নামে একটি টিকা সংস্থাটির পূর্বযোগ্যতা পেয়েছে। উচ্চমাত্রার ডেঙ্গু সংক্রমণ রয়েছে এমন এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে এই টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। টিকাটি দুই ডোজে দিতে হয়, যার মধ্যে ব্যবধান তিন মাস। তবে কোনো দেশে এই টিকা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেখানকার সংক্রমণের ধরন, বয়সভিত্তিক ঝুঁকি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

টিকা এলেও মশা নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই

ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকা নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা চললেও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার কাজ এখনই জোরদার করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা দমন, রোগ শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির যথাযথ চিকিৎসা—সবকিছু একসঙ্গে চালাতে হবে।

বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই নিয়মিত এসব স্থান পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধু মশার ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গুর বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়াও জরুরি। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে সম্ভাব্য ট্রায়াল ভবিষ্যতে রোগ প্রতিরোধের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও ব্যবহারের উপযুক্ততা যাচাইয়ের আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। আপাতত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রধান উপায়।