হাম-রুবেলার সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে চলছে বিশেষ ‘ইনটেনসিফায়েড এমআর ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ কর্মসূচি। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটি ২৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।

তবে এবার বড় চ্যালেঞ্জ শুধু টিকা দেওয়া নয়, বরং টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৩৪ লাখ শিশুর মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশু। বাকি প্রায় ১০ লাখ শিশু চলতি সময়ে ছয় মাস বয়সে পৌঁছে নতুন করে টিকার জন্য যোগ্য হয়েছে।

কিন্তু এই ২৪ লাখ বাদ পড়া শিশুর হিসাব কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিডিনিউজ২৪-এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, নতুন কর্মসূচি শুরুর মাত্র দুই দিন আগে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলো থেকে প্রায় ১২ লাখ বাদ পড়া শিশুর তথ্য পেয়েছিল। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষিত ২৪ লাখ এবং মাঠ থেকে পাওয়া প্রায় ১২ লাখের তথ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যায়।

এর আগে এপ্রিল-মে মাসে দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। সরকারি হিসাবে ওই কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে আরও বিপুলসংখ্যক শিশুর টিকা না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

জুনে পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস কর্মসূচির তথ্যও এই ব্যবধানের বিষয়টি স্পষ্ট করে। ওই কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সেই তথ্যের সঙ্গে আগের হাম-রুবেলা কর্মসূচির হিসাব তুলনা করে প্রায় ৪৩ লাখ শিশু আগের টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। পরে ‘মপ-আপ’ কর্মসূচিতে আরও প্রায় ১৯ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।

তবে মাঠপর্যায়ে এত দ্রুত বাদ পড়া শিশুদের সঠিক তালিকা তৈরি করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে আগেই প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। সেপ্টেম্বরে ইপিআই মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোকে মাত্র তিন দিনের মধ্যে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী বাদ পড়া শিশুদের সংখ্যা দিতে বলেছিল। এত অল্প সময়ে বাড়ি বাড়ি তথ্য যাচাই করে নির্ভুল তালিকা তৈরি করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল।

নতুন কর্মসূচিতে অবশ্য শুধু আগের তালিকার ওপর নির্ভর না করার কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা নেওয়ার তথ্য যাচাই করবেন। আগের তালিকা বা প্রচারণার তথ্যের বাইরে থাকা শিশুদেরও শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।

এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে চলতি বছরের হাম পরিস্থিতির কারণে। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২ লাখে পৌঁছেছে। নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ৯১০ এবং নিশ্চিত ও উপসর্গযুক্ত রোগী মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৩৪ বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার ১০০ শতাংশের বেশি কভারেজ দেখানো হলেও হাম সংক্রমণ কমেনি। এর পরেই টিকাদানের প্রকৃত কভারেজ ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

এই পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচির তথ্যব্যবস্থা নিয়েও সরকার আলাদা পর্যালোচনা শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য অংশীদারের সহায়তায় ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ও টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা চলছে। এতে আটটি বিভাগেই মাঠপর্যায়ের তথ্য, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, টিকাদান সেশন এবং তথ্যব্যবস্থা সরাসরি যাচাই করা হচ্ছে।

সরকারের নতুন ক্যাচ-আপ কর্মসূচি তাই শুধু ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নয়; একই সঙ্গে আগের কর্মসূচির ফাঁকগুলো চিহ্নিত করারও একটি পরীক্ষা। তালিকায় থাকা শিশুর পাশাপাশি মাঠে থাকা কিন্তু কোনো তালিকায় না থাকা শিশুকে শনাক্ত করতে পারলেই কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নিশ্চিত হবে।

বর্তমানে কর্মসূচি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার কত শিশু টিকা পেল এবং মাঠপর্যায়ের বাদ পড়া শিশুদের কতটা শনাক্ত করা গেল—হাম নিয়ন্ত্রণে সেটিই হবে এই ক্যাচ-আপ কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।