দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃ/ত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকার মধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। তাই সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। 

বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় যা যা করা প্রয়োজন, সরকার তার সব ধরনের চেষ্টা করছে। হাসপাতালগুলোতে স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে বলেও জানান তিনি। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষায়, “ডেঙ্গুর জন্য যা যা করণীয়, সব ধরনের চেষ্টা করছে সরকার।” তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। সে কারণেই ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকার ব্যর্থ, এমন বক্তব্যকে তিনি সঠিক মনে করেন না। 

তবে মন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন দেশে ডেঙ্গুর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আরও ১০ জনের মৃ/ত্যু হয়। 

চলতি বছরের শুরু থেকে ওই সময় পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩৫৬ জনে। তাদের মধ্যে ৮৮ হাজার ২৯৯ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তখনও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৫ হাজার ৭৭৬ জন। 

একই সময়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃ/ত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮১ জনে। শুধু সেপ্টেম্বরেই মৃ/ত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনেই আরও ৩৬ জনের মৃ/ত্যুর তথ্য এসেছে, যা পরিস্থিতির তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য রোগীদের সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ার সংখ্যার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় অংশ চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন। তার দাবি, রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে। 

ডেঙ্গুর রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে ঢাকার হাসপাতালগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। 

এর আগে ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জুনে তিনি বলেছিলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ের ৮০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বহন করবে। একই সময়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং চিকিৎসা গাইডলাইন নিয়েও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য আইভি স্যালাইনের মজুত বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জুনে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ এক লাখ ইউনিট আইভি স্যালাইন সরকারকে দেয়। সে সময় কেন্দ্রীয়ভাবে আরও এক লাখ স্যালাইন মজুত থাকার কথা জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয় বলেও এর আগে মন্তব্য করেছেন সাখাওয়াত হোসেন। জুনে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে এক কর্মশালায় তিনি সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা বাড়ানোকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি।

তবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনাও রয়েছে। গত ৪ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান হাম ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তার ওই বক্তব্যের কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন। 

ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে এখন দুটি বিষয় পাশাপাশি সামনে এসেছে। একদিকে আক্রান্ত ও মৃ/ত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার বলছে হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা, চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ, স্যালাইনের ব্যবস্থা এবং শয্যা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকার সফল না ব্যর্থ, সেটি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির চাপ যে এখনও উল্লেখযোগ্য, সেটিই দেখাচ্ছে।