দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৬ দিনেই ২১ হাজার ৭০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং এ রোগে মারা গেছেন ৭৪ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৬ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৫৬ হাজার ৯১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৭১ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরের রোগী সংখ্যা ইতোমধ্যে পুরো আগস্টের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। আগস্টে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, আর ওই মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের। বিপরীতে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৬ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের।

সংক্রমণের গতি আরও স্পষ্ট হয়েছে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে। ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৭৫৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এটিই চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির সংখ্যা। একই সময়ে মারা গেছেন আরও সাতজন।

নতুন রোগীদের বড় অংশই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ভর্তি হয়েছেন। ওই ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১৭৫ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৭৪ জন ভর্তি হন। দুই সিটির বাইরের ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৯৪ জন।

ঢাকার বাইরে খুলনা বিভাগে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩৪৯ জন, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া বরিশালে ১৮৬, চট্টগ্রামে ১৭৭, রাজশাহীতে ১৫৩, ময়মনসিংহে ৮৩, রংপুরে ৫৩ এবং সিলেটে ৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গুর বিস্তার যে শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে মোট ৩৪৯ জন ভর্তি হলেও সিটি এলাকার বাইরে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪০৪ জন।

চলতি বছরের শুরুতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬ হাজার ১০৪ জন। এরপর জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন রোগী ভর্তি হন। সেপ্টেম্বরে মাত্র ১৬ দিনেই আরও ২১ হাজার ৭০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৬ হাজার ৯১৬ রোগীর মধ্যে ৫২ হাজার ৫৭৯ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিলেন কয়েক হাজার রোগী।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের কথা বলা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এক কর্মশালায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর মধ্যে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের ওপর জোর দেন। তিনি আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করেন এবং নভেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বড় অংশও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হয়েছে। জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন মারা যাওয়ার পর সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৬ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। ফলে বছরের মোট ১৭১ মৃত্যুর মধ্যে সেপ্টেম্বরের এই ১৬ দিনেই প্রায় ৪৩ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে চলতি মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ববিদদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়ানোর আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ইতোমধ্যেই আগস্টের পুরো মাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির নতুন রেকর্ড হওয়ায় ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।