বাংলাদেশে সাপের কামড়ে বছরে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ দেশীয় প্রজাতির সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে গড়ে ওঠা ভেনম রিসার্চ সেন্টার এখন অর্থসংকটে ধুঁকছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থায়ন বন্ধ থাকায় গবেষণার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয় সাপের বিষের উপযোগী প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এই গবেষণাকেন্দ্রে বর্তমানে ১১ প্রজাতির প্রায় ৩৭০টি সাপ রয়েছে। এ ছাড়া গবেষণার প্রয়োজনে সংগ্রহ করা প্রায় ১ হাজার ৭০০ গ্রাম বিষ সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই বিষ ব্যবহার করে দেশীয় সাপের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির গবেষণা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সেই কাজের পরবর্তী ধাপ সময়মতো এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
সরকারি বরাদ্দ বন্ধ, প্রকল্পের অনুমোদন অনিশ্চিত
ভেনম রিসার্চ সেন্টার ২০১৮ সালের মার্চে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষধর সাপগুলোর বিষ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির পথ তৈরি করা।
গবেষণাকেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে সরকারি বরাদ্দ বন্ধ থাকায় কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশিত ডেইলি সান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে সংশ্লিষ্ট পরিচালন পরিকল্পনা বন্ধ হওয়ার পর কেন্দ্রটির অর্থায়ন স্থগিত হয়ে যায়। নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হলেও অর্থায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
অর্থসংকটের কারণে শুধু পরীক্ষাগারের গবেষণাই নয়, বিষধর সাপের খাবার জোগাড়, পরিচর্যা এবং কেন্দ্রের নিয়মিত কার্যক্রম চালু রাখাও কঠিন হয়ে উঠেছে। সংগৃহীত বিষ নির্দিষ্ট পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে গবেষণার উপকরণ ও সাপগুলোর দেখভালের জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন।
কেন দেশীয় প্রতিষেধক প্রয়োজন
বাংলাদেশে সাপের কামড়ের চিকিৎসায় বর্তমানে মূলত ভারত থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়। এসব প্রতিষেধক ভারতের কয়েকটি প্রধান বিষধর সাপের বিষের বিরুদ্ধে তৈরি। কিন্তু সাপের প্রজাতি, ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশভেদে বিষের উপাদানে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় সাপের বিষের ক্ষেত্রে আমদানি করা প্রতিষেধকের কার্যকারিতা সব পরিস্থিতিতে সমান নাও হতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাপের বিষের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে স্থানীয় চাহিদার উপযোগী প্রতিষেধক তৈরির গবেষণা এগিয়ে নেওয়া। এতে ভবিষ্যতে দেশীয় সাপের কামড়ের চিকিৎসায় আরও কার্যকর ও সহজলভ্য প্রতিষেধক তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা কিংবা পরীক্ষাগারে প্রাথমিক গবেষণায় অগ্রগতি অর্জন করলেই ব্যবহারযোগ্য প্রতিষেধক তৈরি হয়ে যায় না। এর জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি, বিষ নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা যাচাই, কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা মূল্যায়নের মতো একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক যাচাই ও অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষেধক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায় না।
গবেষণার অগ্রগতি থাকলেও বাকি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
গবেষণাকেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গবেষকেরা রাসেলস ভাইপারের বিষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরির গবেষণার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধাপ সম্পন্ন করেছিলেন। তখন অ্যান্টিবডি সংশ্লেষণ ও বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা চালানোর জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল।
ওই প্রতিবেদনে গবেষকেরা জানান, প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় নিজেদের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ধার নিয়ে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। তবে সেই সময়ের অগ্রগতির তথ্যকে বর্তমান গবেষণার সম্পূর্ণ অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশিত ডেইলি সান-এর প্রতিবেদনেও গবেষণাকেন্দ্রটির অর্থসংকট এবং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সমস্যার কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, গবেষণার ফলাফল ও পদ্ধতি মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও অর্থায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না আসায় পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সাপের কামড়ে বছরে প্রাণ হারান সাড়ে সাত হাজার মানুষ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত জাতীয় জরিপের ফল ২০২৩ সালের ১৮ জুন প্রকাশ করা হয়। জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ৭ হাজার ৫১১ জনের মৃত্যু হয়। আক্রান্তদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের ক্ষেত্রে বিষধর সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ আক্রান্ত গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা।
এই পরিসংখ্যান সাপের কামড়কে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কৃষিকাজ, বসতবাড়ির আশপাশে চলাচল এবং বর্ষা মৌসুমে মানুষের সঙ্গে সাপের সংস্পর্শ বাড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সাপের কামড়জনিত বিষক্রিয়াকে অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের অন্তর্ভুক্ত করেছে। সংস্থাটির নির্দেশনা অনুযায়ী, বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত উপযুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি পরিকল্পনায় রয়েছে স্থানীয় প্রতিষেধক তৈরির লক্ষ্য
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৬ সালে জাতীয় সাপের কামড় ব্যবস্থাপনা কৌশল ও ব্যয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে স্থানীয় সাপের বিষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রতিষেধক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সাপের কামড় প্রতিরোধ, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের ভেনম রিসার্চ সেন্টার এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গবেষণাভিত্তিক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিয়মিত অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল এবং পরীক্ষাগারের অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
গবেষণাকেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ অর্থায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত দেশীয় সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরির কাজ কত দ্রুত এগোবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আর্থিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু একটি গবেষণা প্রকল্প নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিষেধক তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও পিছিয়ে পড়তে পারে।








