ওয়েবসাইট থেকে গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে মাদক বিক্রির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঘিরে ওয়েবসাইট ও গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে মাদক বিক্রির একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী সাইম ইসলাম নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, রাজধানীর ভাটারা এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৩০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি অনলাইনে ‘কুশ’ ও ‘সিনথেটিক গাঁজা’ বিক্রির জন্য ওয়েবসাইট এবং গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করত। সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে ক্যাম্পাস এলাকায় কিউআর কোডযুক্ত কার্ড বিতরণের কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

কিউআর কোড থেকে গোপন গ্রুপে

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, কার্ডে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলে আগ্রহী ব্যক্তিরা একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারতেন। সেখান থেকে তাঁদের একটি গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হতো। এভাবে সরাসরি যোগাযোগের বদলে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্রেতা সংগ্রহ ও মাদক বিক্রির ব্যবস্থা গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।

অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মাদক কারবারিরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন কৌশলে মাদক বিক্রির চেষ্টা করছেন। গোয়েন্দা দল সাইবার নজরদারির মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম শনাক্ত করে অভিযান চালায় বলেও জানান তিনি।

টেলিগ্রাম গ্রুপে ২৫০ শিক্ষার্থী থাকার দাবি

গ্রেপ্তার সাইম ইসলামের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রায় দুই মাস আগে অনলাইনে মাদক বিক্রির উদ্দেশ্যে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন তিনি। পরে ওই ওয়েবসাইটে আসা আগ্রহীদের নিয়ে টেলিগ্রামে একটি গোপন গ্রুপ খোলেন বলে কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়েছেন তিনি।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে কর্মকর্তাদের দাবি, ওই গ্রুপে বসুন্ধরা এলাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থী যুক্ত ছিলেন। তবে এই সংখ্যা গ্রেপ্তার ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতে এসেছে। গ্রুপের সদস্যসংখ্যা বা তাঁদের প্রত্যেকের মাদক কেনাবেচা কিংবা সেবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে যাচাই হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে প্রায় দুই মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত দুই সপ্তাহ ধরে কুশ ও সিনথেটিক গাঁজা বিক্রি করছিলেন সাইম। তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য সামনে এলেও অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

ভাটারার ফ্ল্যাটে অভিযান, উদ্ধার ৩০০ গ্রাম গাঁজা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদের নেতৃত্বে গত ১৬ অক্টোবর ভাটারা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। একটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি করে সাদা পলিথিনে মোড়ানো ৩০০ গ্রাম গাঁজা ও একটি ব্যবহৃত মুঠোফোন জব্দ করা হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, সাইম ইসলামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। তিনি রাজধানীর ভাটারার জোয়ার সাহারা এলাকার লিচুবাগানে একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বাদী হয়ে ভাটারা থানায় মামলা করেন।

অভিযানে মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি কুশের বীজ ও মাদক প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথাও জানিয়েছেন অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান।

বাসায় পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একাধিক মাদক কারবারি চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ওই এলাকায় মাদক বিক্রির কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে অর্ডার করে বাসায় মাদক পৌঁছে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে বলে তাঁর দাবি।

এই বক্তব্য ওই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। বসুন্ধরা এলাকার সব বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষার্থীর সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে

গ্রেপ্তার তরুণের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিলেন কি না, মাদক কোথা থেকে সংগ্রহ করা হতো এবং অনলাইন গ্রুপটির মাধ্যমে কতজনের কাছে মাদক বিক্রি হয়েছে, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে গ্রুপে প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থী যুক্ত থাকার দাবি যাচাই এবং তাঁদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মাদক বিক্রির অভিযোগ মোকাবিলায় সাইবার নজরদারির পাশাপাশি তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের সচেতনতা এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এ ঘটনায় তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এবং কথিত গ্রুপের অন্য সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। ফলে গ্রেপ্তার তরুণের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্য ও তদন্তে প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।