কিশোরদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, উদ্ধার হচ্ছে ধারালো অস্ত্র, সামনে আসছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও হত্যার মতো অপরাধের তথ্য। কিন্তু এসব অপরাধী চক্রের পেছনে যারা অর্থ, আশ্রয় ও প্রভাব জোগাচ্ছে, তাদের অনেকেই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশের তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে রাজধানীতে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১১৮ থেকে বেড়ে ১৫৯ হয়েছে।

১৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সারা দেশে পুলিশের তালিকায় রয়েছে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব চক্রের পেছনে শতাধিক পৃষ্ঠপোষকের নামও এসেছে বলে পুলিশ সূত্রের বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী, আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় প্রমাণের বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচ্য।

এক বছরে ঢাকায় বেড়েছে ৪১টি গ্যাং

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগে সক্রিয় ১৫৯টি গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা তিন হাজারের বেশি। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১১৮। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৪১টি গ্যাং।

পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ঢাকায় ১৫৯টি গ্যাংয়ের পাশাপাশি চট্টগ্রামে ৯৮টি, সিলেটে ১৫টি, রাজশাহীতে ১৩টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে সারা দেশে তালিকাভুক্ত গ্যাংয়ের সংখ্যা ৩৮৬। এসব দলের সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বলে পুলিশি তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত এসব চক্রে শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক নয়, প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। ফলে সমস্যাটি কেবল কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তৃত নেটওয়ার্কও জড়িত থাকতে পারে।

অপরাধের মাঠে কিশোর, নিয়ন্ত্রণে অন্য কেউ?

একসময় পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, দলীয় সংঘর্ষ কিংবা নিজেদের মধ্যে মারামারির ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের নাম বেশি শোনা যেত। এখন ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমি ও বাড়ি দখল এবং হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধেও এসব দলের সদস্যদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং অফিস-আদালতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো কাজেও কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে এসব দলের যোগাযোগের তথ্যও উঠে এসেছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধের ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়া সদস্যদের গ্রেপ্তার করা গেলেও নির্দেশদাতা ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি দলের কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হলেও পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয় না। পুরোনো সদস্যদের জায়গায় নতুন কিশোরদের যুক্ত করে চক্র আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় আধিপত্যের সমীকরণ বদলালেও কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও আগের প্রভাবশালীরা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন, আবার কোথাও নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের আশ্রয়ে এসব চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তবে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন।

এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাই শুধু অস্ত্র উদ্ধার বা ঘটনাস্থল থেকে কিশোরদের আটক করাই যথেষ্ট নয়। কারা তাদের সংগঠিত করছে, অর্থ দিচ্ছে, অপরাধের নির্দেশনা দিচ্ছে কিংবা গ্রেপ্তার এড়াতে সহায়তা করছে, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

কেন অপরাধের পথে যাচ্ছে কিশোরেরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সমাজে শক্তি প্রদর্শন ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় লোকবল প্রয়োজন হয়। অনেক সময় সেই কাজে কিশোরদের ব্যবহার করা হয়।

তাঁর ব্যাখ্যায়, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া সাধারণত ছোট কাজ দিয়ে শুরু হতে পারে। মাদক পৌঁছে দেওয়া, অপরাধীদের খবর দেওয়া, এলাকায় শক্তি প্রদর্শন, চাঁদা তোলা কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজ করতে করতে একপর্যায়ে কিশোরেরা বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অর্থ, পরিচিতি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে লাভের প্রলোভনও তাদের আকৃষ্ট করতে পারে। অধ্যাপক রেজাউল করিমের মতে, এসব কিশোরের একটি অংশ ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধী চক্রের নেতৃত্বে চলে যেতে পারে।

কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক পরিস্থিতি, সামাজিক পরিবেশ, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, মাদকের সহজলভ্যতা এবং অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাবের মতো বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে সব কিশোরের ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

কুমিল্লার হত্যাকাণ্ডে আবার আলোচনায় গ্যাং সংস্কৃতি

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি কিশোর অপরাধ ও গ্যাং সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।

বিবিসি বাংলার ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে পুলিশ জানায়, তাদের মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি ১৭৩ জনকে বিভিন্ন মামলার অভিযোগ, মাদক, মোবাইল কোর্ট, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসংক্রান্ত বিষয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

তবে কোনো অভিযানে আটক হওয়া মানেই প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংয়ে সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। বিবিসি বাংলাকে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জানিয়েছিলেন, আটকদের মধ্যে শিক্ষার্থী, মাদকসেবী ও বিভিন্ন মামলার আসামিও ছিলেন। কাউকে হয়রানি করা পুলিশের উদ্দেশ্য নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এই ঘটনা দেখিয়েছে, কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় বড় ধরনের অভিযান চালানো হলেও একই সঙ্গে ব্যক্তিভিত্তিক যাচাই, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।

পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পুলিশের

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে শুধু সদস্যদের গ্রেপ্তার নয়, তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

বাংলা ট্রিবিউনকে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান বলেন, সারা দেশে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি একই সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করতে উঠান বৈঠক করা হচ্ছে।

অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি সন্তান সন্ধ্যার পর কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে, সে বিষয়ে খোঁজ রাখার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, পরিবার সচেতন হলে কিশোর অপরাধ কমাতে সহায়তা পাওয়া যাবে।

শুধু গ্রেপ্তার নয়, ভাঙতে হবে অপরাধের নেটওয়ার্ক

কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান অপরাধ দমনে তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অপরাধের নির্দেশদাতা, অর্থের জোগানদাতা এবং আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি বদলানো কঠিন। একই সঙ্গে অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

অপরাধের অভিযোগে আটক কিশোরদের ক্ষেত্রে বয়স ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইন অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি যারা জেনেশুনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধে ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

পাড়া-মহল্লায় ‘বড়ভাই’ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কিশোরদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধের পেছনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে দেওয়া গেলে তবেই এসব চক্রের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।