রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে মা/রধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনায় খালিদ হাসান (৩৫) নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় উপস্থিত থেকেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ধানমন্ডি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল হাইকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে ধানমন্ডির মীনা বাজার এলাকা থেকে খালিদ হাসানকে আটক করা হয়। ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীত পাশের ফুটপাতে ঘটনাটি ঘটে। সেখানে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা (৪৮) নামে এক ব্যক্তিকে মা/রধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগ ওঠে খালিদ হাসানের বিরুদ্ধে।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি সামনে আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, ফুটপাতে বসে থাকা ওই ব্যক্তিকে এক যুবক বারবার চড়থাপ্পড় ও লাথি মারছেন। একপর্যায়ে তাঁকে কান ধরে ওঠবস করানো হয়। আশপাশে বেশ কয়েকজন পথচারী জড়ো হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাউকে কার্যকর ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, ঘটনাস্থলের অল্প দূরত্বে পুলিশের সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের উপস্থিতিতেই ওই ব্যক্তিকে মা/রধর করা হলেও তাঁরা তা থামানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন না। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের এমন ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
যে অভিযোগ থেকে ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনার পেছনে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে। ওই তরুণীর দাবি, সোমবার দুপুরে শহীদ আবদুল্লাহ তাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেন। বিষয়টি তিনি ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের জানালেও তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি।
পরে তরুণী মুঠোফোনে তাঁর এক স্বজনকে ঘটনাস্থলে ডাকেন। ওই স্বজন সেখানে পৌঁছে শহীদ আবদুল্লাহকে মা/রধর করেন বলে জানা গেছে।
তবে শহীদ আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে তরুণীর অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আটকের পর আদালতে সোপর্দ
ধানমন্ডি থানার ওসি মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব জানিয়েছেন, শহীদ আবদুল্লাহকে মা/রধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগে খালিদ হাসানকে আটক করা হয়েছে। বুধবার তাঁকে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা অঞ্চলের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খালিদ হাসান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিকস ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন।
অন্যদিকে, মা/রধরের শিকার শহীদ আবদুল্লাহ মানসিক রোগে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন ধানমন্ডি থানার ওসি।
স্বজনকে আটকের ঘটনায় তরুণীর ক্ষোভ
খালিদ হাসানকে আটকের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী তরুণী। তাঁর বক্তব্য, ঘটনার শুরুতে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না।
তরুণীর দাবি, শ্লীলতাহানির অভিযোগ জানানোর পরও ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করতে আগ্রহ দেখাননি। সে কারণেই তিনি তাঁর স্বজনকে ডেকে আনেন।
স্বজনকে আটকের খবর পেয়ে বুধবার সকালে ধানমন্ডি থানায় যান ওই তরুণী। সেখানে পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন, ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়লে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আটক স্বজনের মুক্তি দাবি করেছেন।
পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
ঘটনার সময় উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ধানমন্ডি থানার এএসআই আবদুল হাইকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ধানমন্ডি থানার ওসি জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করছিলেন এএসআই আবদুল হাই। কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে তাঁকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঘটনাস্থলে পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের আরও দুই সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ওসি নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।
ভিডিওতে যা দেখা গেছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুই মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা শার্ট পরা এক যুবক ফুটপাতে বসে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন। একপর্যায়ে তাঁকে চড়থাপ্পড় ও লাথি মারেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন পথচারীকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। তাঁদের কেউ কেউ মা/রধরের শিকার ব্যক্তিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথাও বলেন।
ভিডিওর একপর্যায়ে ওই ব্যক্তির মুঠোফোন নিয়ে তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে দেখা যায়। আশপাশের কয়েকজন পুরো ঘটনা মোবাইল ফোনে ধারণ করেন।
এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি ভিডিওতে দেখা গেলেও তাঁরা মা/রধর বন্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি।
ঘটনাটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর একদিকে তরুণীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ, অন্যদিকে একজন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে মা/রধর এবং সেখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত যুবককে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একজন এএসআইকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।





