কিশোর গ্যাং ও তাদের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান আরও জোরদার করতে যাচ্ছে পুলিশ। রাজধানীর মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর ও দখলকেন্দ্রিক সহিংসতার পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের পেছনে কারা অর্থ, প্রভাব বা আশ্রয় দিচ্ছে, সে তথ্য সংগ্রহেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে আগস্ট মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির দেশের বিভিন্ন ইউনিটকে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলেন। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদেরও কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন তিনি। 

সভায় অতিরিক্ত আইজিপি ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস মো. সায়েদুর রহমান কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্য, কার্যক্রম এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এসব কিশোরকে ব্যবহার করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের একটি সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনাতেও কিশোর গ্যাংকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি সহিংস অপরাধ, সংগঠিত অপরাধী চক্র, কিশোর গ্যাং ও ডিজিটাল প্রতারণাকে প্রধান উদ্বেগের জায়গা হিসেবে উল্লেখ করেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তিন ধাপের কর্মপরিকল্পনাও প্রস্তাব করেছে কমিটি।

নতুন করে অভিযান জোরদারের প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। মিরপুর ১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রথম দফায় গ্রেপ্তার চারজন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ছয়জনকে আদালত কারাগারে পাঠিয়েছে। 

পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, রাড্ডা সেন্টারে হামলায় অংশ নেওয়া প্রায় ১৫০ জনের মধ্যে বেশ কয়েকজন কিশোর ছিল। আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় একটি ভবনে হামলার ঘটনাতেও কিশোরদের উপস্থিতি পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

একই সময়ে রাজধানীর চাঁদ উদ্যান, আদাবর এবং ইসিবি চত্বরসংলগ্ন নিউ গিনি প্রপার্টিজ প্রকল্পে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনায় পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে সর্বশেষ তথ্য পাওয়া গেছে। 

ঢাকার বাইরেও কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপরতিম হত্যার পর জেলা জুড়ে কয়েক দফা অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। চট্টগ্রামেও মঙ্গলবার রাতে প্রতিদ্বন্দ্বী কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

সোমবার কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে মোট ১ হাজার ৩১০ জনকে আটক করা হয়। তবে তাদের মধ্যে অন্তত ৭৩০ জনকে যাচাইয়ের পর অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আটকের সংখ্যাকে সরাসরি অপরাধে জড়িত ব্যক্তির সংখ্যা হিসেবে দেখছে না পুলিশ। 

এর পরদিন কুমিল্লায় চতুর্থ দফার অভিযানে আরও ৩৭৯ জনকে আটক করা হয়। জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় কিশোরদের বিরুদ্ধে অপরাধ ও জনদুর্ভোগের অভিযোগ ছিল, সেসব জায়গা থেকে তাদের আটক করে যাচাই করা হচ্ছে। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এ বছরের মে পর্যন্ত ১২৭টি কিশোর গ্যাং বা উপদল শনাক্ত করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় আরও ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে। এসব গোষ্ঠীর একটি অংশ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বেচাকেনা, এলাকাভিত্তিক আধিপত্য এবং সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত বলে পুলিশের পর্যবেক্ষণ। 

আগের পুলিশি তালিকাতেও মিরপুরে কিশোর অপরাধী চক্রের উপস্থিতি বেশি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও পুলিশের নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। 

সরকারের পক্ষ থেকেও চলমান বিশেষ অভিযান আরও জোরদারের কথা বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী অপরাধী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে এবং তা আরও বাড়ানো হবে। পুলিশের হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী নিয়মিত গ্রেপ্তারও চলছে বলে জানান তিনি। 

পুলিশের বর্তমান কৌশলে তাই শুধু কিশোর সদস্যদের আটক বা গ্রেপ্তার নয়, তাদের সংগঠক, অর্থদাতা এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ রাখার পাশাপাশি যারা তাদের অপরাধে ব্যবহার করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।