দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, হয়রানি ও পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। বিশেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নুরুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ অক্টোবরের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংবাদ সংগ্রহ ও জনস্বার্থে প্রতিবেদন করার সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিষদের বিবৃতি অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে চারজন সাংবাদিক। সংগঠনটি বলেছে, কোনো সংবাদ, মতামত বা সাংবাদিকের পেশাগত কাজ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলেও তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে হামলা, হুমকি কিংবা কাজে বাধা দেওয়ার বৈধতা নেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনাটি ঘটে ৪ অক্টোবর রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একদল ব্যক্তি সেখানে যাওয়ার পর সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। হামলায় আহত চার সাংবাদিক হলেন The Daily Star-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, bdnews24.com-এর আরিফুজ্জামান কোরবান এবং সমকালের মাইনুল ইসলাম রাজু।

প্রত্যক্ষদর্শীরা হামলাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে থাকার অভিযোগ করেছেন। ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে The Daily Star কয়েকজনকে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় কাউকে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি; ৫ অক্টোবর মতিহার থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

এই বিষয়টিই পরে সাংবাদিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, হামলার ভিডিও ফুটেজে জড়িতদের পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ থাকলেও মামলায় কাউকে নির্দিষ্ট করে আসামি করা হয়নি।

ঘটনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।

এদিকে সর্বশেষ অগ্রগতিতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। মঙ্গলবার উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত জানান এবং তদন্তের পর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

ঘটনার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কমিটিকে ঘটনার তদন্ত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছিল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অধিকার সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজিও তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটি বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের নিরাপদে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলেছে।

সিপিজি বিশেষভাবে উদ্বেগ জানিয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় হামলাকারীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি, যদিও ঘটনার ভিডিও ফুটেজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

সম্পাদক পরিষদ তাদের বিবৃতিতে মোট পাঁচটি দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক হামলা, হুমকি ও হয়রানির দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত; জড়িতদের পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা না করে আইনগত ব্যবস্থা; রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, সরকারি দপ্তরসহ জনসমাগমস্থলে সাংবাদিকদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা; পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় বাধা ও ভয়ভীতি বন্ধ করা এবং সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর স্পষ্ট অঙ্গীকার।

সম্পাদক পরিষদ বলেছে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক সমাজের জন্য এটি প্রয়োজনীয় শর্ত। ভয়, হুমকি ও সহিংসতার পরিবেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যকরভাবে করা সম্ভব নয় বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদ করেন। তারা হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার, বহিষ্কার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এখন হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের দিকে নজর রয়েছে। সম্পাদক পরিষদ ও সিপিজির দাবির কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালনের সময় যেন হামলা বা ভয়ভীতির মুখে না পড়েন এবং জড়িতদের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা হয়।