২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন পর্তুগিজ ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতি শেষ হওয়ার পর পর্তুগালের বিখ্যাত ৭ নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর বিদায়কে ঘিরে এখনই বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন।
রোনালদোর ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ)। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, যথাযথ সম্মাননা ছাড়া রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি হতে দিতে চায় না ফেডারেশন। তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারের উপযুক্ত বিদায়ী আয়োজন করতে পরিকল্পনা ও সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চায়, যেখানে সমর্থকেরা এবং পুরো পর্তুগাল আবারও তাঁদের অধিনায়ককে অভিবাদন জানাতে পারবেন। তবে আয়োজনের তারিখ বা ধরন এখনো জানানো হয়নি।
নিজের বিদায়বার্তায় রোনালদো বলেন, জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। ২৩ বছর ধরে এই জার্সি পরা, রক্ষা করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে এটি নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ তাঁর জন্য সম্মান ও দায়িত্বের বিষয় ছিল। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয়ের অনুভূতিও সেখানে কাজ করে।
জাতীয় দলের হয়ে নিজের যাত্রার কথা স্মরণ করে রোনালদো পরিবার, পর্তুগালের মানুষ, সতীর্থ, কোচ ও দলের কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর কোনো গোল যদি সমর্থকদের আনন্দ দিয়ে থাকে, কাউকে স্বস্তি এনে দিয়ে থাকে কিংবা দেশের জন্য গর্বিত হওয়ার উপলক্ষ তৈরি করে থাকে, তাহলে সেই অর্জনই তাঁর কাছে সার্থক বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিদায়বার্তার শেষে তিনি বলেন, পর্তুগাল সব সময় তাঁর অংশ হয়ে থাকবে।
২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগালের জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে দলটির আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪টি ম্যাচ খেলে করেছেন ১৪৬ গোল। পুরুষ আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড দুটিই তাঁর দখলে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু গোলের রেকর্ডই গড়েননি, জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যে ভূমিকা রেখেছেন।
রোনালদোর নেতৃত্বে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জেতে দলটি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর দীর্ঘ পথচলায় রয়েছে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও একাধিক আসরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। এসব সাফল্যের মধ্য দিয়ে পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছেন এই তারকা।
রোনালদোর অবসরের সিদ্ধান্তের আগে পর্তুগালের জাতীয় দলের কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। গত মাসে নেশন্স লিগের একটি ম্যাচে তাঁকে মাঠে না নামানো এবং পরবর্তী সময়ে দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসে। তবে নিজের অবসরের ঘোষণায় এসব ঘটনাকে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেননি রোনালদো। তাই কোচের সঙ্গে মতবিরোধকেই তাঁর অবসরের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাদের বিবৃতিতে রোনালদোকে শুধু একজন অসাধারণ খেলোয়াড় নয়, বরং অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা, নিষ্ঠার উদাহরণ এবং জাতীয় দলের চেতনার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফেডারেশনের মতে, তাঁর অবদান মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দেরও অনুপ্রাণিত করেছে। বিবৃতির শেষে তাঁকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি তাঁর ক্যারিয়ারের পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে এক হাজার গোলের মাইলফলকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও রোনালদোর পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হচ্ছে না। তাঁর ঘোষণাটি কেবল পর্তুগালের জাতীয় দলের হয়ে খেলা নিয়ে। ক্লাব পর্যায়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অবসরের কোনো ঘোষণা দেননি তিনি। ফলে জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর শেষ অধ্যায় সামনে এলেও ক্লাব ফুটবলে আরও কত দিন তাঁকে দেখা যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
পর্তুগালের হয়ে ২৩ বছরের পথচলা শেষ করার সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও নেশন্স লিগের শিরোপা এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছেন রোনালদো। এখন তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের পরিকল্পিত বিদায়ী আয়োজনের দিকে তাকিয়ে সমর্থকেরা।




