বর্তমানে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করছেন ৬ লাখ ৮৫ হাজারেরও বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। আর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৮৭ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট পড়াশোনা শেষ করার প্রায় ১৫ মাসের মধ্যে চাকরি বা পরবর্তী শিক্ষায় যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ডিগ্রি ও নানা বিষয়ে পড়ার সুযোগের কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছেও যুক্তরাজ্য এখনো উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। 

একসময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তরাজ্যে আইন পড়ার আগ্রহই বেশি দেখা যেত। বিশেষ করে ব্যারিস্টারি পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে এই চিত্র বদলেছে। এখন ব্যবসা, ডেটা সায়েন্স, স্বাস্থ্যসেবা, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রযুক্তি, বায়োমেডিকেল সায়েন্সসহ নানা বিষয়ে পড়তে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেছে নিচ্ছেন।

যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দেশটির জনপ্রিয়তার একটি বড় উদাহরণ। Higher Education Statistics Agency (HESA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪/২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৫ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন। একইভাবে, যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ ইমিগ্রেশন পরিসংখ্যানেও শিক্ষার জন্য দেশটির প্রতি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের শেষ ১২ মাসে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৭১টি স্টাডি ভিসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মূল শিক্ষার্থী ছিলেন ৪ লাখ ৬ হাজার ৮২৪ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি।

শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়, পড়াশোনা শেষে তাদের অবস্থানও যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহের অন্যতম কারণ। HESA-এর সর্বশেষ Graduate Outcomes তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩/২৪ শিক্ষাবর্ষের ৮৭ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট পড়াশোনা শেষ করার প্রায় ১৫ মাস পর চাকরি অথবা পরবর্তী উচ্চশিক্ষায় ছিলেন। এই জরিপে ১০ লাখের বেশি যোগ্য গ্র্যাজুয়েটের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিষয়েও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৩/২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যে Business and Management ছিল সবচেয়ে বেশি পড়া বিষয়গুলোর মধ্যে শীর্ষে, যা মোট শিক্ষার্থী ভর্তির ২১ শতাংশ। এর পাশাপাশি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও নতুন ধরনের পেশাভিত্তিক বিষয়েও আগ্রহ বাড়ছে।

বাংলাদেশ থেকেও গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করার পর থেকে AHZ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স বাছাই, আবেদন এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার যাত্রায় সহায়তা করেছে। 

২০২৬ সালের ইনটেক গুলোতেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। AHZ-এর মাধ্যমে এরই মধ্যে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চিত করেছেন বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা AHZ-MH Global Group-এর একটি প্রতিষ্ঠান,এর মাধ্যমে ১৪০টিরও বেশি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫০ হাজারের বেশি কোর্স সম্পর্কে জানতে ও আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছে।

এর মধ্যে বিভিন্ন Russell Group বিশ্ববিদ্যালয়সহ Aston University ও University of Dundee-এর মতো প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য AHZ-এর সেবা বিনামূল্যে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স বাছাই থেকে শুরু করে প্রোফাইল মূল্যায়ন, আবেদন প্রক্রিয়া, ভর্তি ও স্কলারশিপসংক্রান্ত গাইডলাইন, পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ। সময়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছে। ফলে অনেক কোর্সে শুধু বইয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ, প্লেসমেন্ট ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

Supply Chain and Logistics, Business Analytics, Space Science এবং Biomedical Sciences-এর মতো বিষয়গুলোতে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। CIPS, CILT এবং AACSB-এর মতো পেশাজীবী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও পেশাগত সংযোগও শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করছে। তবে এসব সুবিধা বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্দিষ্ট কোর্সভেদে ভিন্ন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা ডিগ্রির গুরুত্বই নয়; ভবিষ্যৎ চাকরির সুযোগ, ব্যবহারিক দক্ষতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং ক্যারিয়ার সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর এই পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ থাকায় যুক্তরাজ্য এখনো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।

বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত সুযোগ এবং পড়াশোনা শেষে চাকরি বা পরবর্তী শিক্ষায় যাওয়ার সম্ভাবনা। সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তাই যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ এখন আর শুধু আইন বা কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে সামনে রেখে আরও বিস্তৃত পরিসরে যুক্তরাজ্যকে বেছে নিচ্ছেন তারা।