মাটির নিচে মেট্রোরেল স্টেশন, কমলাপুর থেকে রামপুরায় শুরু হচ্ছে প্রস্তুতি
রাজধানী ঢাকায় দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিতে নতুন ধাপে প্রবেশ করছে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্প। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এই রুটের চারটি ভূগর্ভস্থ স্টেশনে চলতি অক্টোবর মাসেই ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। স্টেশনগুলো হলো কমলাপুর, রাজারবাগ, মালিবাগ ও রামপুরা। প্রকল্পের চুক্তি প্যাকেজ-৩-এর আওতায় এসব এলাকায় প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. সারওয়ার উদ্দিন খান।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চারটি স্টেশনে ইউটিলিটি স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য, বিদ্যমান সেবা সংযোগ সরিয়ে নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা প্রস্তুত করা এবং পর্যায়ক্রমে ভূগর্ভস্থ স্টেশন নির্মাণের পথ তৈরি করা।
চার স্টেশনে কী ধরনের কাজ হবে
এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর, রাজারবাগ, মালিবাগ ও রামপুরা এলাকায় মাটির নিচে থাকা বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইন ও সেবা সংযোগ স্থানান্তর করা হবে। ভূগর্ভস্থ স্টেশন নির্মাণের আগে এসব সংযোগের অবস্থান শনাক্ত করা এবং নির্মাণকাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সংযোগগুলো সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ইউটিলিটির মধ্যে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও অন্যান্য নাগরিক সেবার অবকাঠামো থাকতে পারে। এসব সংযোগ অপরিকল্পিতভাবে সরানো হলে নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নির্মাণের উপযোগী জায়গা তৈরি করার পাশাপাশি বিদ্যমান পরিষেবা সচল রাখাও এ কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ইউটিলিটি লাইন সরিয়ে একটি সমন্বিত ‘ইউটিলিটি কমন করিডোরে’ নেওয়ার কাজ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে যুক্ত রয়েছে বলে প্রকল্পের তথ্য জানিয়েছে।
কোন এলাকায় কতটা এগিয়েছে কাজ
এমআরটি লাইন-১-এর অন্য কয়েকটি স্টেশনেও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ চলছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সারওয়ার উদ্দিন খান জানিয়েছেন, চুক্তি প্যাকেজ-৪-এর আওতায় নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা ও আফতাবনগর স্টেশনে এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা ও আফতাবনগর এলাকায় ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি। অন্যদিকে, চুক্তি প্যাকেজ-৬-এর আওতায় বিমানবন্দর, টার্মিনাল-৩ ও খিলক্ষেত স্টেশনে এবং প্যাকেজ-৫-এর আওতায় নর্দা স্টেশনে এ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।
অর্থাৎ, চারটি নতুন স্টেশনে কাজ শুরু হলে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে ইউটিলিটি স্থানান্তরের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। তবে সব স্টেশনের কাজ একই সময়ে শেষ হবে না। সংশ্লিষ্ট চুক্তি প্যাকেজ ও নির্মাণ পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে বাকি কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
ইউটিলিটি স্থানান্তর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটির নিচের অবকাঠামো একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। রাজধানীর সড়কের নিচে বিভিন্ন সময়ে স্থাপিত পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের সংযোগ রয়েছে। এসব লাইনের অবস্থান ও ব্যবহার বিবেচনায় না নিয়ে খননকাজ শুরু করলে বিদ্যমান সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে মূল নির্মাণকাজের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউটিলিটি লাইন শনাক্ত, স্থানান্তর ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হয়। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পেও এই প্রস্তুতিকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট স্থানে সেবা সংযোগ সরানোর পর সেখানে মূল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।
তবে ইউটিলিটি স্থানান্তর শেষ হওয়া আর স্টেশন নির্মাণ শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। স্থানান্তরের পর প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত প্রস্তুতি, নির্মাণকাজের ধাপ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির বাস্তবায়ন অনুযায়ী স্টেশন নির্মাণ এগোবে।
যানজট ও নাগরিক ভোগান্তি নিয়ে সতর্কতা
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোর পাশে ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ চললে যান চলাচলে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে মালিবাগ, রামপুরা, রাজারবাগ ও কমলাপুরের মতো এলাকায় সড়ক ব্যবহারকারী, গণপরিবহনের যাত্রী এবং আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চলাচল ও কার্যক্রমের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের আশপাশে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। তবে নতুন করে শুরু হতে যাওয়া চারটি এলাকায় কোন সড়কে কখন কাজ হবে, কতটুকু জায়গা ব্যবহার করা হবে কিংবা বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে নেই।
এর আগে প্রকল্পের অন্য এলাকায় ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজের কারণে যানজটের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে প্রগতি সরণির বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটসংলগ্ন অংশে চলমান কাজের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে যান চলাচলে ভোগান্তির কথা তুলে ধরা হয়। তবে ওই এলাকার পরিস্থিতিকে নতুন চারটি স্টেশনের সম্ভাব্য পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যাবে না।
কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সড়ক ব্যবস্থাপনা, সাময়িক চলাচল পরিবর্তন ও নাগরিক সেবা সংক্রান্ত নির্দেশনা পাওয়া গেলে যাত্রীদের জন্য আগাম পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল
এমআরটি লাইন-১ বাংলাদেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল প্রকল্প। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি দুটি রুটে বিভক্ত। এর একটি বিমানবন্দর রুট, অন্যটি পূর্বাচল রুট।
বিমানবন্দর রুটের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার। এ পথে ১২টি ভূগর্ভস্থ স্টেশন থাকবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়ে টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, নর্দা, নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, আফতাবনগর, রামপুরা, মালিবাগ ও রাজারবাগ হয়ে রুটটি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে, পূর্বাচল রুটের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার। এই অংশে সাতটি উড়াল ও দুটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন থাকবে। নতুনবাজার থেকে শুরু হওয়া রুটটি পূর্বাচল এলাকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। দুটি রুট মিলিয়ে প্রকল্পটি রাজধানী ও আশপাশের এলাকার গণপরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। প্রকল্পটি ১২টি চুক্তি প্যাকেজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন অংশে স্টেশন, রেললাইন, ডিপো এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আলাদা প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের ডিপো নির্মাণের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পিতলগঞ্জ এলাকায় ৩৫ দশমিক ৯০ হেক্টর, অর্থাৎ প্রায় ৮৮ দশমিক ৭১ একর জমির ভূমি উন্নয়নকাজ ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট শেষ হয়েছে। এ কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ১ মার্চ।
এদিকে, ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করেছে বলে বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রকল্প দুটিতে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়ন করছে।
২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ইউটিলিটি স্থানান্তরের লক্ষ্য
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে কিছু কার্যক্রম ২০২৭ সালের অক্টোবর বা নভেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব এলাকায় কাজ শেষ হবে কি না, তা পরবর্তী অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
চারটি নতুন স্টেশনে ইউটিলিটি স্থানান্তর শুরু হলে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণের প্রস্তুতি আরও এগোবে। তবে এ কাজের পর কোন স্টেশনে মূল নির্মাণকাজ কখন শুরু হবে, সে বিষয়ে আলাদা সময়সূচি প্রয়োজন।
চালু হলে কী সুবিধা পেতে পারেন যাত্রীরা
এমআরটি লাইন-১ চালু হলে বিমানবন্দর, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে গণপরিবহনে নতুন সংযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সড়কনির্ভর যাত্রার ওপর চাপ কমানো এবং রাজধানীর যাতায়াতব্যবস্থা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বিমানবন্দর ও কমলাপুরের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে দ্রুত ও পরিকল্পিত গণপরিবহন সুবিধা পাওয়া গেলে যাত্রীদের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি হবে। তবে প্রকৃত যাত্রাসময়, ভাড়া, ট্রেন চলাচলের ব্যবধান ও সেবার অন্যান্য বিবরণ জানতে প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিচালন পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, কমলাপুর, রাজারবাগ, মালিবাগ ও রামপুরায় ইউটিলিটি স্থানান্তরের প্রস্তুতি এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের পরবর্তী অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন কাজের সময়সূচি, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শেষ করার ওপর নজর থাকবে।







