ঢাকার জলাধার ভরাট করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন না দিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজউককে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নগরীর জলাবদ্ধতা, বন্যা ও দূষণের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
শনিবার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে নদী ও পাখিবিষয়ক চার দিনব্যাপী একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান। ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ বা ধরা আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে দেশের নদী, পাখি ও জীববৈচিত্র্যের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার জলাবদ্ধতা, বন্যা ও দূষণসহ ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকার জলাধার ভরাট করে কোনো প্রকল্প অনুমোদন না দিতে রাজউককে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজধানীর দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে জলাধার, নিম্নভূমি ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদেরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংকুচিত হলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে সরে যেতে পারে না। এতে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা বাড়ে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন আলোচনাতেও জলাধার ভরাট, খাল সংকুচিত হওয়া এবং অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পের বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপেও নগরীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে ইকোপার্ক ও ওয়াটার পার্ক তৈরির সুপারিশ রয়েছে, যদিও এসব পরিকল্পনার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দেশের অনেক নদী একসময় প্রবলভাবে প্রবাহিত হলেও এখন সেগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেছে। সরকার নদীর সেই প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাধার রক্ষা, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, সুন্দরবনে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্লাস্টিকের চাপ কমানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা বলেন, নদী ও পাখি শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, এগুলো বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়েরও অংশ। নদী শুকিয়ে যাওয়া, সংকুচিত হওয়া এবং পাখির সংখ্যা কমে যাওয়াকে তিনি পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, পরিবেশ ও নদী রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিকদেরও এতে ভূমিকা রাখতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
ঢাকায় প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণে আগে থেকেই আইন রয়েছে। প্রাকৃতিক জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণসংক্রান্ত আইনে জলাধারের শ্রেণি বা প্রকৃতি পরিবর্তনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা ভরাটের অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানীর বর্তমান জলাবদ্ধতা সমস্যার পেছনেও এই প্রবণতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জলাধার ও খাল সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগও কমছে।
প্রধানমন্ত্রীর নতুন নির্দেশনার পর এখন রাজউকের প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জলাধার সংরক্ষণের বিষয়টি আরও কঠোরভাবে বিবেচিত হওয়ার কথা। নতুন আবাসন, বাণিজ্যিক বা অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির প্রকৃতি এবং তা কোনো জলাধার বা বন্যাপ্রবাহ এলাকার অংশ কি না, সেটি যাচাইয়ের গুরুত্বও বাড়বে।
ঢাকার অবশিষ্ট জলাধার, খাল ও নিম্নভূমি রক্ষা করা গেলে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ধরে রাখতেও এসব জলাধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রাজউকের প্রকল্প অনুমোদন, নিয়মিত নজরদারি এবং জলাধার দখল ও ভরাটের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ওপর। দ্রুত নগরায়নের চাপে ঢাকার প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষার এই সিদ্ধান্ত এখন বাস্তব প্রয়োগের পরীক্ষার মুখে।


