মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এ জন্য ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
চিঠিতে দুই দণ্ডিত ব্যক্তির সব সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে সেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে চিঠি পাঠানোর অর্থ এই নয় যে, তাঁদের সব সম্পদ ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। এখনো সম্পদ শনাক্ত ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
কেন দ্রুত সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় প্রসিকিউশন
চিফ প্রসিকিউটরের স্বাক্ষর করা চিঠিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ দ্রুত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া না হলে তাঁরা এসব সম্পদ ভোগ, বিক্রি কিংবা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। এতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে দুই দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে সেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠি পাঠানোর বিষয়টি চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম নিজেও নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব এবং আইনমন্ত্রীর একান্ত সচিবকেও চিঠির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
২০২৫ সালের রায়ে ছিল সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
একই রায়ে তাঁদের বাংলাদেশে থাকা সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মামলাসংশ্লিষ্টদের পরিবার এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেন ট্রাইব্যুনাল।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনেও রায়ের এই নির্দেশনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সম্পদ বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিকল্পনা
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাজেয়াপ্ত সম্পদ আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো আইনস্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণের বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে সম্পদের পরিমাণ, বাজারমূল্য কিংবা বিক্রি করে কত টাকা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত হিসাব নেই। সম্পদ শনাক্ত, তালিকাভুক্ত ও মূল্যায়নের পরই প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে আমিনুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পদ বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থের ৫০ শতাংশ জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিতরণের বিষয়টি রায়ে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে রায়ের ভাষা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন তিনি।
আপিলের সময়সীমা নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর
শেখ হাসিনার পক্ষে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে কোনো আপিল করা হয়নি বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১ ধারায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের জন্য ৩০ দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই সময়ের মধ্যে আপিল না হওয়ায় রায়ের সম্পদ বাজেয়াপ্ত-সংক্রান্ত অংশ বাস্তবায়নে আইনগত বাধা নেই।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন আসামির আপিল অন্য আসামির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো আপিল হয়নি বলেও জানান তিনি।
তবে এটি প্রসিকিউশনের আইনি অবস্থান। সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রচলিত আইন অনুসরণ করতে হবে।
অন্য দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের উদ্যোগও আসছে
শুধু শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল নন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলায় আরও কয়েকজনের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, যাচাই-বাছাই করে এমন প্রায় ১১ থেকে ১২ জনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। পর্যায়ক্রমে তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে।
বাসসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত আরেকটি মামলায় ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজনের সম্পদের ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ওই মামলার নির্দেশনা শেখ হাসিনা ও কামালের মামলার রায় থেকে আলাদা।
এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষা
চিফ প্রসিকিউটরের চিঠির পর এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। প্রথমে সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, পরে সেগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় বিক্রির বিষয়টি সামনে আসবে।
তবে সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের কাজ কবে শেষ হবে, নিলাম বা বিক্রির প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ কবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
ফলে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্তের রায় বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।




