সুনামগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং পুলিশ হেফাজত থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে করা মামলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতাসহ সাতজনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। কারাগারে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে ওই নেতার বাবা, মা ও ভাই রয়েছেন। একই মামলায় গ্রেপ্তার ১৬ বছর বয়সী তাঁর ছোট বোনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় নিরাপদ আবাসনে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম সাতজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অন্যদিকে, কিশোরীকে নিরাপদ আবাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেন নারী ও শিশু আদালত।
কারাগারে যাঁরা গেলেন
কারাগারে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক দেওয়ান শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স (২০), তাঁর বাবা শাহরুখ রাজা চৌধুরী, মা শাম্মী আক্তার পলি এবং ভাই শাহরিয়ার চৌধুরী পিয়াল।
এ ছাড়া প্রিন্সের তিন বন্ধু ইফাত আলম রাবিদ, কাওছার আহমদ সোহাগ ও তাকবির রহমান তানহিরকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
প্রিন্সের ১৬ বছর বয়সী বোন সাবরিনা চৌধুরী রূপকথাকে একই মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাঁকে কারাগারের পরিবর্তে নিরাপদ আবাসনে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে সিলেট নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাঁদের আদালতে হাজির করা হলে সাতজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
কী ঘটেছিল সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর রাতে নাশকতার একটি মামলায় প্রিন্সকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় নেওয়া হয়।
থানায় নেওয়ার কিছুক্ষণ পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিলেটে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।
পুলিশের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রিন্সের পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন সহযোগী সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেন এবং পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হেফাজত থেকে প্রিন্সকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
পুলিশের দাবি, এ সময় সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করা হয়।
পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ পরিবারের
প্রিন্সকে গ্রেপ্তারের পর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রিন্স অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের কারণেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
তবে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। পুলিশের দাবি, থানায় নেওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
এ বিষয়ে পরিবারের অভিযোগ এবং পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা কিংবা অসুস্থতার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পুলিশের মামলায় ১১ জনের নাম
হাসপাতালে পুলিশের ওপর হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফরিদ হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন।
মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের অভিযোগ, অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছেন এবং হেফাজতে থাকা আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে দুই পক্ষের অভিযোগই গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনাটিতে একদিকে পুলিশের ওপর হামলা ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আদালত সাতজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিলেও এতে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমনটি নয়। মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পাশাপাশি প্রিন্সের অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ এবং তাঁর পরিবারের নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়টিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।




