দেশের বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থা অনলাইনে নেওয়ার পাশাপাশি এর তথ্য ধাপে ধাপে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, এতে একজন ব্যক্তির আগের বিয়ে, তালাক ও বৈবাহিক অবস্থার তথ্য দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হবে।

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের জন্য অনলাইনে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন সফটওয়্যার ব্যবহারের ওপর ১০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে দেশের সব নিকাহ রেজিস্ট্রারকে ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, অনলাইন নিবন্ধন চালু হলে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের বৈবাহিক সম্পর্কের তথ্য একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা যাবে। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি আগে বিয়ে করেছেন কি না, একাধিক বিয়ে থাকলে তার তথ্য এবং নতুন বিয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না—তা যাচাই করা সহজ হবে।

বর্তমানে একই ব্যক্তি আগের বিয়ের তথ্য গোপন করে অন্য জায়গায় বিয়ে করার চেষ্টা করলে তা শনাক্ত করা সব ক্ষেত্রে সহজ নয়। প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিবন্ধিত তথ্য অনলাইনে যাচাই করা গেলে এমন তথ্য গোপনের সুযোগ কমবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। একই সঙ্গে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর আগের বৈবাহিক সম্পর্কের তথ্য জানার সুযোগও তৈরি হবে।

এই ব্যবস্থার সঙ্গে NID, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের তথ্য যুক্ত করার বিষয়টি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন আসাদুজ্জামান। তার ভাষ্য, সরকারি তথ্যভান্ডারগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ তৈরি হলে নাগরিকের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।

এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের ডিজিটাল ব্যবস্থার পাইলট কার্যক্রম শুরু করা হবে। তখন বলা হয়েছিল, প্রাথমিকভাবে ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে এই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ওই ব্যবস্থায় বয়স ও পরিচয় যাচাইয়ের জন্য NID এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযোগের কথাও জানানো হয়েছিল।

আইন মন্ত্রণালয়ের ওই উদ্যোগের আওতায় অনলাইন নিবন্ধন সফটওয়্যার তৈরির কাজও এগিয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, সফটওয়্যারের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল এবং NID ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন তথ্যভান্ডারের সঙ্গে API সংযোগ স্থাপনের কথাও জানানো হয়েছিল। পাইলট প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১১ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত।

আইনমন্ত্রীর মতে, ডিজিটাল নিবন্ধন চালু হলে বাল্যবিবাহ শনাক্ত করাও সহজ হবে। একই সঙ্গে দেশে বছরে কত বিয়ে হচ্ছে এবং বিয়ে-সংক্রান্ত আইন কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ ও যাচাইয়ের জন্য একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার কাজে আসবে।

বিবাহের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের আরেকটি সম্ভাব্য ব্যবহার হিসেবে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিরোধের কথাও উল্লেখ করেছেন আইনমন্ত্রী। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর একাধিক ব্যক্তি স্ত্রী বা সন্তান হিসেবে দাবি করলে নিবন্ধিত তথ্য দেখে বৈবাহিক সম্পর্ক যাচাই করা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি জানান।

বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এই তথ্য কাজে লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। কোনো ব্যক্তি বিদেশে স্ত্রীকে সঙ্গে নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ অনলাইনে নিবন্ধিত তথ্য যাচাই করে বৈবাহিক সম্পর্কের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবে—এমন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন আইনমন্ত্রী।

সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থার ব্যবহার ও কার্যক্রম নিকাহ রেজিস্ট্রারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিস্তৃত করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিবাহ ও তালাকের তথ্য বিভিন্ন সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।

সরকারি বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থার ওয়েবসাইটেও নাগরিক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে NID বা জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহারের অপশন দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রস্তাবিত আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিয়ে নিবন্ধনের তথ্য যাচাইয়ের পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।