চেক ডিজঅনার মামলায় শুধু পত্রিকায় নোটিশ দেওয়ার বিধান নিয়ে হাইকোর্টের প্রশ্ন

চেক ডিজঅনারের মামলা দায়েরের আগে শুধু সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে আইনি নোটিশ জারির বিধানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। ২০০৬ সালে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টে যুক্ত হওয়া এই বিধান কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।

রোববার (১ নভেম্বর) বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

রুলে আইন সচিব, ঢাকা জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। তবে আদালত এখনো আইনটির সংশ্লিষ্ট বিধান বাতিল করেননি। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জবাব চাওয়া হয়েছে।

যে আইনি বিধান নিয়ে প্রশ্ন

চেক ডিজঅনারের মামলা পরিচালিত হয় নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার অধীনে। এই ধারায় চেকের টাকা ব্যাংক থেকে পরিশোধ না হলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চেকদাতার বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

আইনের ১৩৮ ধারার উপধারা (১এ)-এর দফা (সি) অনুযায়ী, চেকের টাকা পরিশোধের দাবিতে পাঠানো আইনি নোটিশ বহুল প্রচারিত বাংলা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমেও জারি করা যায়।

এ ছাড়া নোটিশ পৌঁছানোর আরও দুটি পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমটি হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে সরাসরি নোটিশ পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো প্রাপকের পরিচিত বা সর্বশেষ জানা ঠিকানায় প্রাপ্তিস্বীকারসহ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো।

অর্থাৎ প্রচলিত আইনে তিনটি পদ্ধতির যেকোনো একটির মাধ্যমে নোটিশ জারির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শুধু সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নোটিশ দেওয়ার পদ্ধতিটি ব্যক্তির ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সেই প্রশ্নই এখন আদালতের সামনে এসেছে।

আড়াই কোটি টাকার চেক নিয়ে রিট

রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মুহাম্মদ ফখর উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে আড়াই কোটি টাকার চেক ডিজঅনারের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। ওই মামলায় তাঁর মক্কেলের সাজাও হয়েছে।

আইনজীবীর দাবি, তাঁর মক্কেল মামলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। ২০২২ সালে তাঁর একটি চেক হারিয়ে যায়। পরে সেই হারানো চেক ব্যবহার করে একটি চক্র তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার আগে আইনি নোটিশ পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে নোটিশ পৌঁছে দেওয়া কিংবা রেজিস্টার্ড ডাকযোগে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু একটি সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেই নোটিশ জারির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

এভাবে একজন ব্যক্তিকে সরাসরি অবহিত না করে শুধু পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রাখা কতটা আইনসংগত, তা নিয়েই রিটটি করা হয়।

আদালতে দুই পক্ষের আইনজীবী

রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মুহাম্মদ ফখর উদ্দিন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী আসিফ আক্তার ও জান্নাতুল নাদিয়া।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী।

প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান, ২০০৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।

রুলের পর কী হবে

হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে চেক ডিজঅনার মামলায় সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে নোটিশ জারির বিধানটির বৈধতা এখন বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় এসেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী শুনানি ও প্রয়োজনীয় আদেশ দেবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত প্রচলিত আইনের বিধান বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

চেক ডিজঅনার মামলায় নোটিশ পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে এই রুলের নিষ্পত্তি হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আইনি নোটিশ জারি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা আসতে পারে।