সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদ ও দায়ের বিবরণী নিয়মিত প্রকাশের সুপারিশ করা হলেও এখনো তা বাধ্যতামূলক করতে কোনো আইনি ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপারিশটি দেওয়ার প্রায় ২০ মাস পরও আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আইন বা বাধ্যতামূলক বিধান চালু হয়নি।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ৩৫১ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের বিচারপতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি তিন বছর পরপর সম্পদ বিবরণী দেওয়ার বিষয়টি ছিল।

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, শুধু বিবরণী জমা নয়, সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা আদালতের ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট সম্পদের তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাও করার কথা বলা হয়েছিল। কমিশনের যুক্তি ছিল, নিয়মিত সম্পদ প্রকাশ বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে জবাবদিহি জোরদার করবে।

তবে বর্তমান ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য এমন বাধ্যতামূলক প্রকাশ-প্রক্রিয়া নেই। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বিচারপতিদের তালিকা, আদালতের কার্যক্রম ও বিভিন্ন নথি প্রকাশ করা হলেও বিচারপতিদের সম্পদ বিবরণীর কোনো নিয়মিত প্রকাশব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য প্রযোজ্য বিচারিক আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি চাইলে একজন বিচারপতিকে তাঁর সম্পদ ও দায়ের বিবরণী প্রকাশ করতে হবে। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতির অনুরোধে বিবরণী দেওয়ার বিধান আছে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পরপর সবার সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার আলাদা ব্যবস্থা নেই।

অধস্তন আদালতের বিচারকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির আওতায় তাঁরা নির্দিষ্ট সময় পরপর সম্পদ বিবরণী জমা দেন বলে বিচার বিভাগ সংস্কার নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেও অধস্তন আদালতের বিচারকদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদ প্রকাশের বিষয়টি অবশ্য বাংলাদেশে একেবারে নতুন নয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক নিজের সম্পদ বিবরণী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কাছে জমা দেন। পরে তিনি আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদেরও সম্পদ বিবরণী জমা দিতে আহ্বান জানান; কয়েকজন বিচারপতি তখন তা করেন।

বর্তমান সংবিধান বিচারপতিদের বিচারিক দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ৯৪(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতি তাঁদের বিচারিক দায়িত্ব পালনে স্বাধীন থাকবেন। ফলে সম্পদ প্রকাশের মতো জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সামগ্রিক চিত্রও এখন আলোচনায় রয়েছে। সেপ্টেম্বরের এক পর্যালোচনায় দ্য ডেইলি স্টার জানায়, কমিশনের বেশ কয়েকটি বড় সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। কমিশন বিচারকদের নিয়োগ, শৃঙ্খলা, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনসহ একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আইনজীবী ও বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বিচারকদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের জন্য স্পষ্ট নিয়ম তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এর আগে বিচারক ও আদালতের কর্মকর্তাদের সম্পদ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার পক্ষে মত দেন এবং বিচারকদের জন্য নির্দিষ্ট দুর্নীতিবিরোধী বিধান তৈরির কথা বলেন।

এদিকে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পাঁচজন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৯৯ জন বিচারপতি রয়েছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সবার জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর সম্পদ বিবরণী জমা ও তা প্রকাশের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা চালু করতে হলে নতুন আইন, বিধি বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রয়োজন হবে।

সুতরাং বর্তমান অবস্থায় বিষয়টি হলো—বিচারপতির সম্পদ বিবরণী চাওয়ার সুযোগ আচরণবিধিতে রয়েছে, কিন্তু তা নিয়মিত ও প্রকাশ্য করার বাধ্যবাধকতা নেই। ২০২৫ সালের বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পরও সেই ঘাটতি পূরণ হয়নি; ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো কীভাবে তৈরি করা হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

:::