পাঁচ জেলায় নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের

ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের উন্নত রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট (ইনমাস) স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ প্রকল্পে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। তবে প্রকল্পটি এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপন করা হবে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের পুরো অর্থ সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

যেসব রোগের সেবা মিলবে

প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত ইনস্টিটিউটগুলোতে ক্যানসার, হৃদরোগ, থাইরয়েড, কিডনি ও যকৃতের বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করতে আধুনিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নত রোগনির্ণয়ের পাশাপাশি নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে নিউক্লিয়ার মেডিসিনভিত্তিক চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হবে।

প্রকল্প প্রস্তাবে পিইটি-সিটি, স্পেক্ট-সিটি, স্পেক্ট, বোন মিনারেল ডেনসিটি পরিমাপক যন্ত্র, ফোর-ডি আলট্রাসাউন্ড, কালার ডপলার ও থাইরয়েড স্ক্যানারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। রোগের ধরন অনুযায়ী এসব প্রযুক্তি শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের অবস্থা, অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে।

ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য

বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীদের প্রায়ই ঢাকায় যেতে হয়। এতে যাতায়াত, থাকা এবং চিকিৎসার অন্যান্য খরচ বাড়ে। নতুন পাঁচটি ইনস্টিটিউট স্থাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিজ নিজ অঞ্চলে উন্নত রোগনির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো।

বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং এ রোগে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন। ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, অধিকাংশ ক্যানসার রোগীকে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বর্তমানে ঢাকায় যেতে হয়। এ পরিস্থিতিতে সেবা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষ যেন অন্তত নিজ নিজ বিভাগে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে পারেন, সরকার সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

প্রকল্পে থাকছে ভবন নির্মাণ ও জনবল প্রশিক্ষণ

প্রস্তাবিত ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকার প্রকল্পে শুধু ভবন নির্মাণ নয়, চিকিৎসাসেবা চালুর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরির ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আওতায় দেশি ও বিদেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, আসবাবপত্র এবং যানবাহন সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা মূলধনী খাতে এবং প্রায় ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা রাজস্ব খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হবে।

অনুমোদনের আগে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন

পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ২০২৬ সালের ১০ মে প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কয়েকটি বিষয়ে ব্যাখ্যা ও সংশোধনের সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে ছিল যন্ত্রপাতির বিস্তারিত বিবরণ, আমদানি ও স্থানীয়ভাবে কেনাকাটার হিসাব, লাইসেন্স ও বিমা ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সচল রাখা হবে, তার পরিকল্পনা।

পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব সংশোধন করে আবার পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়। কমিশন প্রকল্পটি একনেকে বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে। তবে ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় পর্যন্ত প্রকল্পটি একনেকের বিবেচনাধীন ছিল। ফলে এখনো নির্মাণকাজ শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করা যায়নি।

দেশে বর্তমানে ২২টি ইনমাস

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, দেশে ৩৭টি মেডিকেল কলেজের বিপরীতে বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে ২২টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউট রয়েছে। নতুন পাঁচটি প্রতিষ্ঠান চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের বিশেষায়িত সেবার পরিধি আরও বাড়বে।

নতুন কেন্দ্রগুলো রোগনির্ণয়ের সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা এবং নিউক্লিয়ার মেডিসিনে দক্ষ জনবল তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে বলে প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিকল্পিত সুবিধাগুলো বাস্তবে পেতে প্রকল্পের অনুমোদন, নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করার কাজ সম্পন্ন করতে হবে।