বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব শিশুদের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ২০২৬ সালে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে নিশ্চিত এবং সন্দেহভাজন মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫৫। এর মধ্যে ১০৪টি মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

একই সময়ে নতুন করে ৯৫৫টি সন্দেহভাজন সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে বছরজুড়ে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৮৪৮। এ ছাড়া পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া আক্রান্তের সংখ্যা ২২ হাজার ৩২৮-এ পৌঁছেছে।

সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা, টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং অসুস্থ শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে হামের জটিলতা দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

টিকাদানে ঘাটতি কেন উদ্বেগের

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস থেকে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে। পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে একই ঘরে বা কাছাকাছি পরিবেশে থাকা মানুষের মধ্যেও দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

বাংলাদেশে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় যথাক্রমে শিশুর ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে। দুটি ডোজ সম্পন্ন করা হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের টিকাদান জরিপে প্রথম ডোজের আওতা ছিল ৮৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের আওতা ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, টিকাদানের এই ঘাটতির কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে থেকে যায়।

বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে বিশেষ কর্মসূচি

চলমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশজুড়ে বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়। এটি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।

এ কর্মসূচিতে নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকাদানের অবস্থা যাচাই করছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৯৮ লাখের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে বলে বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

৭ অক্টোবর স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত আরও ৩৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। এদিকে, টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে ডব্লিউএইচওর সহায়তায় ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের টিকাদান ও রোগ নজরদারি ব্যবস্থার একটি স্বাধীন পর্যালোচনাও শুরু হয়েছে।

কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন

হামের প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তবে শুধু ফুসকুড়ি দেখে হাম নিশ্চিত করা যায় না; চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শিশুর শ্বাসকষ্ট, খেতে বা পান করতে না পারা, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, খিঁচুনি কিংবা অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। হামের জটিলতায় নিউমোনিয়া, তীব্র পানিশূন্যতা ও মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইউনিসেফের পরামর্শ অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসকের নির্দেশনায় ভিটামিন এ দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আক্রান্ত শিশুদের ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন এ-এর দুটি ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করে। তবে শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শেই এটি দিতে হবে।

অভিভাবকদের করণীয়

শিশুর বয়স অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, টিকাকার্ড দেখে নিশ্চিত করুন।

কোনো ডোজ বাদ পড়লে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

হাম সন্দেহ হলে শিশুকে নিয়ে জনাকীর্ণ স্থানে যাওয়া এড়িয়ে চলুন এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার আগে সম্ভব হলে তাদের জানিয়ে দিন, যাতে অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে ওষুধ বা উচ্চমাত্রার ভিটামিন এ দেবেন না।

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদানব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা এবং অসুস্থদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সময়মতো টিকা নেওয়া এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে হামের গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।