ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের উন্নত পরীক্ষা নিরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট (ইনমাস) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। তবে প্রকল্পটি এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী ও পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন পাঁচটি ইনমাস স্থাপন করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে আধুনিক রোগনির্ণয় প্রযুক্তি যুক্ত করে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণের আগের পরিকল্পনার পরিবর্তে হালনাগাদ প্রতিবেদনে প্রকল্পটি ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থ সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বাসসকে জানিয়েছেন, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জন্য ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং এ রোগে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন। বর্তমানে অনেক রোগীকে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হলে অন্তত নিজ নিজ বিভাগে ক্যানসারের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো সরকারের লক্ষ্য।

রাজধানীর বাইরে বিশেষায়িত রোগনির্ণয় সুবিধা বাড়ানো গেলে রোগীদের যাতায়াতের চাপ কমানোর পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্প অনুমোদন, অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার পরই এসব সুবিধা বাস্তবে পাওয়া যাবে।

যেসব আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা

প্রস্তাবিত পাঁচটি ইনমাসে আধুনিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও রোগনির্ণয় প্রযুক্তি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের নথিতে পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি ও কম্পিউটেড টমোগ্রাফির সমন্বিত প্রযুক্তি পিইটি-সিটি, স্পেক্ট-সিটি, স্পেক্ট, বোন মিনারেল ডেনসিটি (বিএমডি), ফোর-ডি আলট্রাসাউন্ড, কালার ডপলার এবং থাইরয়েড স্ক্যানারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

নিউক্লিয়ার মেডিসিনে তেজস্ক্রিয় পদার্থের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম ও রোগের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। নির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্তকরণ, রোগের বিস্তার মূল্যায়ন এবং থাইরয়েড, কিডনি, যকৃৎ ও হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার পরীক্ষা করা সম্ভব। কোন রোগীর জন্য কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা নির্ভর করবে তাঁর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর।

প্রকল্পের আওতায় শুধু ভবন নির্মাণ নয়, দেশীয় ও আমদানি করা চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ, জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, আসবাবপত্র এবং প্রয়োজনীয় যানবাহন কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো চালুর জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও প্রকল্পের অংশ।

ব্যয়ের বড় অংশ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোতে

প্রকল্পের প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা মূলধনী ব্যয় এবং প্রায় ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা রাজস্ব ব্যয় হিসেবে ধরা হয়েছে। মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশ মূলধনী খাতে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্প প্রস্তাবে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রায় ১৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব রয়েছে। এর বড় অংশ আমদানি করা চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহে ব্যয় হওয়ার কথা। প্রকল্পের অর্থায়ন পুরোপুরি সরকারি তহবিল থেকে করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদনের আগে যেসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে

পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ২০২৬ সালের ১০ মে প্রকল্প প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ পূরণের শর্তে কমিটি প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করে। পরে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব আবার কমিশনে জমা দেওয়া হয়।

প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা পর্যালোচনার সময় লাইসেন্স ও বিমা খরচের যৌক্তিকতা, দেশীয় ও আমদানি করা যন্ত্রপাতির বিস্তারিত বিবরণ, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম কীভাবে সচল রাখা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছিল।

সংশোধিত প্রস্তাবে বাস্তবায়নের বিস্তারিত সময়সূচি এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবকাঠামো ও সেবা চালু রাখার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি একনেকে বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে। তবে বাসসের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

দেশে বর্তমানে ২২টি ইনমাস

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৭টি মেডিকেল কলেজের বিপরীতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ইতোমধ্যে ২২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ইনমাস স্থাপন করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা ও বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রয়েছে। মহাখালী টিবি হাসপাতাল প্রাঙ্গণেও একটি ইনমাস রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস)।

নতুন পাঁচটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জায়গা পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের নথিতে স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নতুন ইনমাসগুলো চালু হলে ক্যানসারসহ জটিল রোগের আধুনিক পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা ও নিউক্লিয়ার মেডিসিনে দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রেও সহায়তা মিলতে পারে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষ করাই এখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান ধাপ।