ক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৫.৩ শতাংশ কমেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল বেশি।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ Bangladesh Development Update-এ যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের এই পিছিয়ে পড়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে যথাক্রমে ৩, ৩.৬ ও ১১.৬ শতাংশ। অর্থাৎ মার্কিন বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমলেও বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুধু বাংলাদেশ নয়, সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে দেশটির মোট পোশাক আমদানি প্রায় ৩৫.১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল পোশাক চাহিদার প্রভাবও রয়েছে।
তবে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু বাজারের চাহিদা কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিন ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর ক্রয় সিদ্ধান্তে এখন পণ্যের দামের পাশাপাশি কমপ্লায়েন্স, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নমনীয়তা এবং দ্রুত বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সক্ষমতা আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (USFIA) ২০২৬ সালের বেঞ্চমার্কিং স্টাডিতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ৩০টি বড় মার্কিন ফ্যাশন কোম্পানির প্রতিনিধিদের ওপর করা ওই জরিপে বাংলাদেশের পোশাক ব্যবহারের হার ২০২৫ সালের ৮৮.২ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ৭৮.৯ শতাংশে নেমেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধীরগতির বাজারে পৌঁছানো, সীমিত সরবরাহ-শৃঙ্খল নমনীয়তা এবং কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
USFIA-এর হিসাবে, বাংলাদেশের speed-to-market বা দ্রুত বাজারে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতার স্কোর ছিল ৫-এর মধ্যে মাত্র ২.৩। মার্কিন ক্রেতাদের কাছে দ্রুত অর্ডার পূরণ এবং পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন সামঞ্জস্য করার বিষয়টি এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি দুর্বল হয়ে যায়নি। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির মূল্যের ১১.৩ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে। এই হিসাবে বাংলাদেশ ছিল ভিয়েতনামের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী। একই সময়ে চীনের অংশ নেমে আসে ৯.৭ শতাংশে।
পরবর্তী জুলাইয়ের তথ্যেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখে। তবে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৬.৫ শতাংশ কমে ৪.৬৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ বাজারে অবস্থান ধরে রাখলেও রপ্তানি মূল্য কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বাড়ছে। জানুয়ারি-জুনে যুক্তরাষ্ট্রে কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি ১২ শতাংশের বেশি এবং ইন্দোনেশিয়ার ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ভিয়েতনামও সামান্য প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর অভ্যন্তরীণ খরচের চাপও রয়েছে। এর আগে রপ্তানি কমার কারণ ব্যাখ্যা করতে বিজিএমইএ উচ্চ ব্যাংক সুদ, জ্বালানি ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বন্দর পরিচালনার সমস্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছিল। বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়ায় পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর অর্ডার কমে যাওয়ার বিষয়টিও সংগঠনটি উল্লেখ করে।
মার্কিন ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর সাম্প্রতিক আচরণেও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। USFIA-এর জরিপ বলছে, কোম্পানিগুলো এখন একক কোনো বড় উৎপাদনকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বদলে ভৌগোলিকভাবে সরবরাহ উৎস ছড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে কম সংখ্যক কিন্তু বেশি সক্ষম সরবরাহকারীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ার প্রবণতাও বাড়ছে।
এ কারণে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ এখন শুধু উৎপাদন খরচ কম রাখা নয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নতুন চাহিদা অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স আরও শক্তিশালী করা, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, উৎপাদন ও সরবরাহে নমনীয়তা আনা এবং দ্রুত অর্ডার পূরণের সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ এবং মার্কিন ক্রেতাদের জরিপ—দুটিই একই দিকে ইঙ্গিত করছে: বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী, কিন্তু প্রতিযোগিতার মাপকাঠি বদলে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু কম দামের পোশাক দিয়ে বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে; মান, নির্ভরযোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও দ্রুততার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
