কর্ণফুলী টানেলের লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখবে সংসদীয় কমিটি
১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলের আর্থিক লোকসানের কারণ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং বর্তমান আয়-ব্যয়ের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে কমিটি। তিন বছর আগে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এই টানেলে প্রত্যাশার তুলনায় কম গাড়ি চলায় পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় টোল আদায় কম হচ্ছে।
১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী বৈঠকে বিষয়গুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে। তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও নেওয়া হবে।
আয় কম, পরিচালন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ
কর্ণফুলী টানেলের আর্থিক সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে প্রত্যাশার তুলনায় কম যান চলাচল এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চ ব্যয়।
২৯ জুন সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টানেল থেকে মাসে গড়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা টোল আদায় হয়। বিপরীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয় প্রায় ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, মাসে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান প্রায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
টানেলের ভেতরে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, আলো, বায়ু চলাচল, অগ্নিনিরাপত্তা, সিসিটিভি নজরদারি ও যান চলাচল ব্যবস্থাপনা সচল রাখতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যয় সংকোচন এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন উদ্যোগে দৈনিক পরিচালন ব্যয় উদ্বোধনের পরের প্রায় ৩৭ লাখ টাকা থেকে কমে ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকায় এসেছে। তারপরও টোলের আয় দিয়ে পুরো ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না।
প্রত্যাশিত গাড়ির তুলনায় চলাচল অনেক কম
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর কর্ণফুলী টানেল উদ্বোধন করা হয়। পরদিন ২৯ অক্টোবর থেকে যান চলাচলের জন্য এটি খুলে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগরের সঙ্গে নদীর দক্ষিণ পাশের আনোয়ারা এলাকার যোগাযোগ উন্নত করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যে পরিমাণ যান চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৮ হাজার ৩৫০টি গাড়ি চলাচলের পূর্বাভাস ছিল। অথচ ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক যান চলাচল ছিল প্রায় ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার। অর্থাৎ, পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশের মতো গাড়ি টানেল ব্যবহার করছিল।
আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, শুধু টোলের হার বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং টানেলের ব্যবহার বাড়াতে সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা, পণ্যবাহী যানবাহনকে আকৃষ্ট করা এবং আশপাশের শিল্পাঞ্চলের বিকাশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন
কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ ব্যয় নিয়েও বিভিন্ন সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে একাধিক অঙ্ক উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে প্রকল্পের ব্যয় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, আইএমইডির মূল্যায়ন নিয়ে ২ জুলাই প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় আগের সংশোধিত হিসাবের ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ, ওই হিসাব অনুযায়ী ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। প্রকল্পের অর্থায়নে চীনা সরকারের ঋণ ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থ রয়েছে।
কমিটির তদন্তে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যান চলাচলের পূর্বাভাস কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, প্রকল্পের ব্যয় কীভাবে বেড়েছে এবং বাস্তবায়নের সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল কি না, সেসব বিষয় পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
লোকসান কমাতে ৩৩৬ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্প
টানেলের ব্যবহার বাড়াতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও চন্দনাইশের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। বাসসের ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে।
প্রস্তাবিত সড়কটি আনোয়ারার কালাবিবির দীঘি মোড় থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজ গেট পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মাধ্যমে কর্ণফুলী টানেল ব্যবহার করে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের মহাসড়কে সরাসরি যাতায়াত সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বাসসকে জানিয়েছেন, বর্তমানে টানেল দিয়ে কক্সবাজারমুখী যানবাহনকে ঘুরপথে মহাসড়কে উঠতে হয়। নতুন সড়ক চালু হলে কক্সবাজার যেতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়কটির দুটি অংশের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কার্যাদেশ দেওয়া হলে নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং ঠিকাদার কাজ শুরু করার পর দুই বছরের মধ্যে তা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সড়ক নির্মাণ শেষ হওয়ার পর টানেলে যান চলাচল কতটা বাড়বে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
শিল্পায়ন ও যোগাযোগ বাড়ানোর সুপারিশ
আইএমইডির মূল্যায়নে টানেলকে আর্থিকভাবে কার্যকর করতে সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা, আনোয়ারা অঞ্চলে শিল্পায়ন এবং বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাশে শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং দুই পাশের সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে টানেলের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ নয়, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, পণ্য পরিবহন ও নগর পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। টানেল দিয়ে চলাচল করলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা থাকলেও যানবাহনের কাছে বিকল্প পথ বেশি সুবিধাজনক হলে তারা টানেল এড়িয়ে যেতে পারে।
তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, এখন সেদিকেই নজর
সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তের পর এখন মূল প্রশ্ন, কর্ণফুলী টানেলের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কোথায় ঘাটতি ছিল এবং লোকসান কমাতে কোন পদক্ষেপ সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পূর্বাভাস, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, যান চলাচলের বাস্তব চিত্র এবং পরিচালন ব্যয়ের হিসাব একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে সমস্যার উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, সংযোগ সড়ক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে টানেলের ব্যবহার বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে। সংসদীয় কমিটির পরবর্তী বৈঠকে কী তথ্য উঠে আসে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লোকসান কমাতে কী সুপারিশ দেয়, তার ওপরই এখন নজর থাকবে।






