বাংলাদেশের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বিভিন্ন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ইয়ার্ডগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অন্যান্য অনুমোদন দ্রুত করার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পের আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনায় গঠিত কমিটির সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু। বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের অনুমোদন পেতে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, সেটি কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। Daily Observer-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে বর্তমানে ৪৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সংশ্লিষ্ট ফাইল ও ছাড়পত্র চট্টগ্রাম থেকেই প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ তৈরি হলে এই সময় কমানো সম্ভব হবে বলে সভায় আলোচনা হয়েছে।

শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান সভায় একটি কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, জাহাজ রিসাইক্লিং কার্যক্রমের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর লক্ষ্যে একটি কার্যকর দল কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়া এক জায়গা থেকে সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে পরিবেশগত মান বজায় রাখার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। সভায় ইয়ার্ড আধুনিকায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত মান পরিপালনের পাশাপাশি হংকং কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড’ তৈরির নির্দেশিকা প্রণয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

জাহাজ রিসাইক্লিং থেকে উৎপন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য TSDF বা Treatment, Storage and Disposal Facility স্থাপনকে সরকার এখন অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই স্থাপনা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, দেশে প্রয়োজনীয় TSDF না থাকায় ইউরোপীয় জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক পক্ষ বাংলাদেশে ব্যবসা করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছে। তাঁর মতে, ইউরোপীয় জাহাজে থাকা বিভিন্ন উচ্চমানের পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের বাজার কাজে লাগাতে হলে নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।

এই TSDF কেবল জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পের জন্য নয়, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পের ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও ব্যবহার করা যাবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা IMO জানিয়েছে, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশের প্রথম TSDF স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করা হয়েছে।

IMO-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত স্থাপনাটি জাহাজ রিসাইক্লিংসহ বিভিন্ন শিল্প থেকে আসা ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য নিরাপদে শোধন ও নিষ্পত্তিতে ব্যবহার করা হবে। সংস্থাটি বলেছে, TSDF ছাড়া হংকং কনভেনশন ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মান পুরোপুরি পূরণ করা বাংলাদেশের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পের জন্য কঠিন হবে।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি জাহাজ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডকে হংকং কনভেনশন এবং জাতীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে Ship Recycling Plan তৈরি ও অনুমোদন নিতে হয়। এতে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান শনাক্তকরণ, নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

এর আগে আগস্টেও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সভায় জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পকে পরিবেশসম্মত, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাতে রূপান্তরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তখন জাতীয় পর্যায়ে TSDF, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য শোধন, বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উপকূলীয় পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়

সরকারের বর্তমান উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা। বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে বাংলাদেশের নিয়ম ও মানদণ্ডকে জাহাজ নির্মাণ ও রিসাইক্লিংয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে তুলনীয় করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকার শুধু নতুন নিয়ম তৈরির বদলে বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য ব্যবস্থা চায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে প্রশাসনিক বাধা কমানোর কথাও সভায় উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প দেশের ইস্পাত ও পুনর্গলন শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে এখন শুধু জাহাজ ভাঙার সক্ষমতা নয়, পরিবেশ, শ্রমিক নিরাপত্তা, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান পরিপালনের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা—দুই দিক একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য সরকারের। চট্টগ্রামভিত্তিক দ্রুত অনুমোদন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং TSDF বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তবে কার্যকর হয় তার ওপর।