দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগের তাগিদ আইএমএফের

দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তরুণদের মানসম্মত শিক্ষা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

১৪ অক্টোবর ২০২৬, ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা ঘিরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি খাতের বিকাশের গুরুত্ব উঠে আসে।

দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠী বড় সম্ভাবনা

দক্ষিণ এশিয়ায় বিপুলসংখ্যক তরুণ ও কিশোর-কিশোরী রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহজ হতে পারে।

তবে তরুণের সংখ্যা বেশি হলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল নিশ্চিত হয় না। উপযুক্ত চাকরির অভাব, দক্ষতার ঘাটতি এবং শ্রমবাজারে প্রবেশের বাধা থাকলে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন

তরুণদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ নয়, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনেও গুরুত্ব দিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ ও দক্ষ জনগোষ্ঠী কর্মক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশিক্ষণকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কর্মসংস্থানে বেসরকারি খাতের ভূমিকা

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের সুফল পেতে হলে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের বিকাশ, নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সুযোগ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানো, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন সহজ করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারে প্রবেশ এবং চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানোও প্রয়োজন।

প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বিস্তারে কর্মক্ষেত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে নতুন পেশা ও কাজের সুযোগ তৈরি হলেও কিছু প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা, কারিগরি জ্ঞান এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কর্মজীবনে প্রবেশের পরও নতুন দক্ষতা শেখা ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলে পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজ হবে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশেও বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উপযুক্ত চাকরির সুযোগ তৈরি করা গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ করে শিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করা, নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের দক্ষতার সঙ্গে শিল্প ও সেবা খাতের চাহিদার মিল ঘটাতে পারলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

আইএমএফের আলোচনায় উঠে আসা এসব বিষয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে। তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে তা ব্যক্তিগত আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতেও সহায়ক হতে পারে।