বাংলাদেশে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জনের রক্তে সীসার মাত্রা নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের Multiple Indicator Cluster Survey (MICS) 2025-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয়ভাবে এই হার ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

এবারের জরিপে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের রক্তে সীসাসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরিমাপ করা হয়েছে। প্রায় ৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারের ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৬৭টি জরিপ এলাকার তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সীসার ক্ষেত্রে ১২–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রামকে জরিপে নির্ধারিত সীমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের গড় রক্তে সীসার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২১ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার।

ঢাকায় জাতীয় হারের চেয়ে অনেক বেশি

অঞ্চলভেদে পরিস্থিতিতে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। প্রাথমিক ফলাফলে ঢাকায় ৬৫ শতাংশের বেশি শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া যায়। সিলেটে এই হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ ছিল।

অর্থাৎ রাজধানীর শিশুদের ক্ষেত্রে সীসার উচ্চমাত্রার উপস্থিতি জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। তবে জরিপের ফলাফল সীসার নির্দিষ্ট উৎস বা কোনো একটি শিল্পকে সরাসরি এই আঞ্চলিক পার্থক্যের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি।

ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারও একটি পরিচিত উৎস

বাংলাদেশে সীসা দূষণের পরিচিত উৎসগুলোর মধ্যে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিয়ন্ত্রিত বা অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার অন্যতম। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক এলাকার কাছাকাছি এ ধরনের ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম থেকে সীসা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তবে MICS 2025-এর জাতীয় ফলাফল থেকে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারকেন্দ্রিক এলাকার শিশুদের জন্য আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট হার পাওয়া যায় না। তাই ওই এলাকাগুলোতে সীসার মাত্রা জাতীয় ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশের চেয়ে কতটা বেশি—এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা এই জরিপের নামে উল্লেখ করা ঠিক হবে না।

শিশুদের জন্য কেন উদ্বেগের

শৈশবের এই বয়সে সীসার সংস্পর্শ মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার সক্ষমতা, আচরণ ও সামগ্রিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত। ইউনিসেফ বলছে, সীসার ক্ষতিকর প্রভাব শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং ছোট বয়সে সংস্পর্শের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে সীসার সংস্পর্শের সম্ভাব্য উৎস শুধু শিল্প বা ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার নয়। পরিবেশ, মাটি, ধুলা, খাদ্য, রং, খেলনা ও অন্যান্য পণ্যের মাধ্যমেও শিশুদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে ইউনিসেফ জানিয়েছিল, সীসার উৎস ও শিশুদের সংস্পর্শে আসার পথগুলো চিহ্নিত করতে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

গর্ভবতী নারীদের মধ্যেও সীসা

MICS 2025-এ গর্ভবতী নারীদের রক্তেও সীসার উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে ১৫–৪৯ বছর বয়সী গর্ভবতী নারীদের ৭ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে নির্ধারিত সীমার ওপরে সীসা পাওয়া গেছে।

ইউনিসেফ ও বিবিএসের এই জরিপের বিশেষত্ব হলো, এর আগে বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের এত বড় জরিপে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের রক্তে ভারী ধাতুর এমন পরিমাপ ছিল না। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সীসা দূষণের চিত্র বোঝার জন্য MICS 2025 একটি বড় পরিসরের তথ্যভিত্তি তৈরি করেছে।

ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জরিপে ১১ হাজারের বেশি শিশু ও ২ হাজারের বেশি গর্ভবতী নারীর রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছিল। ফলাফল সামনে আসার পর শিশুদের সীসার সংস্পর্শের উৎস শনাক্ত করা এবং তা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, MICS 2025-এর ফল বলছে—সীসার উচ্চমাত্রার সংস্পর্শ বাংলাদেশের শিশুদের জন্য জাতীয় পর্যায়ের একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে ঢাকাসহ উচ্চহারের এলাকাগুলোতে সীসার উৎস শনাক্ত, নিয়মিত নজরদারি এবং শিশুদের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।