ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ধীরগতির প্রভাবে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারে মন্দাভাব তৈরি হয়েছে। গত দুই বছরে গাড়ি আমদানির খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, টানা তিন বছর ধরে কমছে ব্যক্তিগত গাড়ির নতুন নিবন্ধন।
বারভিডার হিসাবে, ২০২২ সালে দেশে ১৬ হাজার ৬৯৫টি ব্যক্তিগত যাত্রীবাহী গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছিল। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৭৮৪টিতে। ২০২৪ সালে নিবন্ধিত হয় ১০ হাজার ৪৯৯টি এবং ২০২৫ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৮৭টিতে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নিবন্ধিত হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৫৮টি ব্যক্তিগত গাড়ি। মাসিক গড় নিবন্ধনের এই হার অপরিবর্তিত থাকলে বছর শেষে সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ১৮৭টিতে দাঁড়াতে পারে। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় নিবন্ধন কমতে পারে প্রায় ১৩ শতাংশ।
দুই বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ
বারভিডার মহাসচিব রিয়াজ রহমান জানিয়েছেন, টাকার অবমূল্যায়নের কারণে গত দুই বছরে গাড়ি আমদানির খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
১ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, বারভিডার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। বারভিডা কার এক্সপো ২০২৬ সামনে রেখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের গাড়ির বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিও তুলে ধরেন সংগঠনের নেতারা।
বারভিডার প্রথম সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুল ইসলাম সম্রাট বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমে যাওয়ায় আমদানিকারকদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একপর্যায়ে ডলারের মূল্য প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, আগে একটি সাধারণ মানের গাড়ির দাম যেখানে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ছিল, এখন তা বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ একই ধরনের গাড়ি কিনতে ক্রেতাদের আগের তুলনায় প্রায় ৮ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।
মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে ব্যক্তিগত গাড়ি
গাড়ির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নতুন গাড়ি কিনতে আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বারভিডার নেতারা বলছেন, জাপান থেকে গাড়ি সংগ্রহের খরচও বেড়েছে। দেশটির নিলাম বাজারে গাড়ির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকারকদের ব্যয় আরও বাড়ছে।
জনপ্রিয় মডেল টয়োটা অ্যাক্সিওর উদাহরণ দিয়ে সাইফুল ইসলাম সম্রাট জানান, একটি নন-হাইব্রিড অ্যাক্সিও আমদানিতে শুল্ক ও কর বাবদ প্রায় ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়। একই মডেলের হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে এ ব্যয় প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
ফলে গাড়ির মূল আমদানি মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং শুল্ক-কর মিলিয়ে ক্রেতাদের মোট ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
কমছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিও
দেশের গাড়ির বাজারে মন্দাভাবের প্রভাব পড়েছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতেও। বারভিডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ২১ হাজার ৩৩৭টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছিল। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৫১৯টি।
অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি আরও কমে ১৯ হাজার ৯৬৮টিতে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ হার ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কম।
আমদানি কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়েও প্রভাব পড়ছে। বারভিডার মহাসচিব রিয়াজ রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ আয় ৬ শতাংশের বেশি কমেছে।
২০ হাজার কোটি টাকার বাজারে চাপ
বাংলাদেশের গাড়ির বাজারের আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এ বাজারে নতুন ও পুরোনো গাড়ি আমদানি, বিক্রি, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং বিক্রয়োত্তর সেবার সঙ্গে বহু প্রতিষ্ঠান ও কর্মী যুক্ত রয়েছেন।
বারভিডার নেতাদের মতে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আগের মতো গাড়ি আমদানি করতে পারছেন না। ফলে বিক্রেতা, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে গাড়ির বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ৫ থেকে ৭ নভেম্বর ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় তিন দিনব্যাপী বারভিডা কার এক্সপো আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী। এতে টয়োটা প্রিয়াস, করোলা ক্রস, হ্যারিয়ার, নোয়া, ভক্সি ও আলফার্ডসহ জাপানের বিভিন্ন জনপ্রিয় মডেলের গাড়ি প্রদর্শন করা হবে। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য রাখা হয়নি।
তিন বছর ধরে নিম্নমুখী গাড়ির নিবন্ধন
বিআরটিএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন ছিল ১৬ হাজার ৬৯৫টি। পরের বছর তা এক ধাক্কায় কমে ১০ হাজার ৭৮৪টিতে নেমে আসে। এরপর ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৪৯৯টি এবং ২০২৫ সালে ৯ হাজার ৩৮৭টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়ির নতুন নিবন্ধন
বিআরটিএর বার্ষিক তথ্য এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্টের হিসাব।
গাড়ির সংখ্যা২০২২16,695২০২৩10,784২০২৪10,499২০২৫9,387২০২৬ (জানু-আগস্ট)5,458
২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন কমেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। আর চলতি বছরের প্রথম আট মাসের পরিসংখ্যানও বাজারের দুর্বল চাহিদার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে আট মাসের নিবন্ধনকে পুরো বছরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সময়ের পার্থক্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ডলারের উচ্চমূল্য, টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ দেশের ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারকে সংকুচিত করছে। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে গাড়ির বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা কাটানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।



