স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাবে। এর আগে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর দেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা ছিল।
নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালকেও অতিরিক্ত তিন বছর সময় দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। আবেদনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কাঠামোগত সংস্কার এবং উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও সময়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
পরবর্তী সময়ে সিডিপি বাংলাদেশের আবেদন ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে। তবে অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে দেশের বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেয় কমিটি।
২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ পরিষদকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুপারিশ করে। এরপর কূটনৈতিক আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমর্থনের ভিত্তিতে অক্টোবরের শেষ দিকে চূড়ান্ত অনুমোদন আসে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন বাজারে বিশেষ শুল্কসুবিধা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার কিছু পরিবর্তিত বা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার হতে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিনির্ভর শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, নতুন বাজার তৈরি এবং বাণিজ্যচুক্তির প্রস্তুতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অতিরিক্ত তিন বছরের মধ্যে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাড়তি প্রস্তুতিকাল বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য অবকাঠামোর উন্নয়নে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে শুধু সময় বাড়ানোর বিষয়টিই গুরুত্ব পায়নি। প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং জাতীয় উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, তিন বছরের অতিরিক্ত সময় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে এই সময় যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ বাতিল হয়নি; বরং উত্তরণের আগে প্রস্তুতির সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা।








