যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের জন্য প্রতিযোগিতার সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৫.৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল বা OTEXA-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪.০১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সামগ্রিক মার্কিন পোশাক আমদানিও এই সময়ে ৮ শতাংশের বেশি কমেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পতনের পেছনে বাজার সংকোচনের প্রভাব রয়েছে, তবে প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ একই বাজারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে।

বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ Bangladesh Development Update-এ বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির এই চ্যালেঞ্জটি আলাদাভাবে উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চাহিদা কমার পাশাপাশি ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে।

আগের মতো শুধু কম উৎপাদন খরচ এখন আর ক্রেতা টানার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ক্রেতারা এখন পণ্যের দাম ছাড়াও উৎপাদনের নমনীয়তা, শ্রম ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স, দ্রুত বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সক্ষমতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এ পরিবর্তনের একটি উদাহরণ পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন শিল্পের ২০২৬ সালের বেঞ্চমার্কিং গবেষণাতেও। সেখানে বাংলাদেশে মার্কিন ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর ব্যবহার হার ২০২৫ সালের ৮৮.২ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ৭৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। গবেষণায় বাংলাদেশের ধীরগতির সরবরাহ, সীমিত নমনীয়তা ও কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কথাও উঠে এসেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মার্কিন ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় পোশাক সরবরাহকারী এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়েও দেশটি মার্কিন বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী ছিল। ওই সাত মাসে রপ্তানি ৬.৫ শতাংশ কমে ৪.৬৬ বিলিয়ন ডলারে নামলেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে।

বরং পরিবর্তনটি হচ্ছে ক্রেতাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন কোম্পানিগুলো এখন একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বদলে বিভিন্ন দেশে সরবরাহের ভিত্তি ছড়িয়ে দিতে চাইছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, শুল্কনীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করছে।

প্রতিযোগীদের পারফরম্যান্সেও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত আছে। প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনাম থেকে পোশাক আমদানি ৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া থেকে ৩.৬ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া থেকে ১১.৬ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি তাই শুধু উৎপাদন খরচ কম রাখা নয়। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত নকশা ও পণ্য পরিবর্তন, ছোট ও মাঝারি আকারের অর্ডার সামলানো, সময়মতো চালান পাঠানো এবং কারখানার শ্রম ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়ানো এখন প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও রপ্তানির গতি বাড়াতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থার আগের রপ্তানি-বিষয়ক উদ্যোগগুলোতে পরিবেশগত, সামাজিক ও মানসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়ার নজিরও রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সাম্প্রতিক পতনকে একমাত্র বাংলাদেশের নিজস্ব দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সময়ে মার্কিন পোশাক আমদানির সামগ্রিক বাজারও সংকুচিত হয়েছে। জুনে আবার বাংলাদেশ থেকে আমদানি একক মাস হিসেবে আগের বছরের তুলনায় ৫.৭৪ শতাংশ বেড়েছিল, যা দেখায় বাজারে চাহিদার ওঠানামাও বড় ভূমিকা রাখছে।

তারপরও প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে নতুন সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজন স্পষ্ট হচ্ছে। কারণ বিশ্ববাজারে পোশাক ক্রেতার কাছে এখন কম দাম গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও সেটিই আর একমাত্র সিদ্ধান্তের ভিত্তি নয়। সময়মতো সরবরাহ, মান, কমপ্লায়েন্স এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা—সব মিলিয়েই অর্ডার পাওয়ার সক্ষমতা নির্ধারিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামনে তাই নতুন বাস্তবতা হলো—সস্তা উৎপাদন থেকে দক্ষ, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীতে পরিণত হওয়া। আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্ত থাকবে, সেটি অনেকটাই নির্ভর করবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পটি কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে তার ওপর।