বিশ্বের হালাল অর্থনীতির বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। খাদ্যপণ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, পোশাক, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাত নিয়ে গড়ে ওঠা এই অর্থনীতির আকার ২০২৪ সালে প্রায় ৭.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ডিনার স্ট্যান্ডার্ডের ‘গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি রিপোর্ট ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৩৪ সাল নাগাদ এই বাজারের আকার ১২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি করেছে। সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত ‘ইনভেস্টরস মিট আপ ৩.০’ শীর্ষক সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যে এ চিত্র উঠে আসে। সম্মেলনে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সনদায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের উৎস শনাক্তের মতো বিষয়গুলোতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
৭ নভেম্বর বিডিফেয়ার্স ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) ঢাকা অ্যাচিভার্সের যৌথ উদ্যোগে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), লেদার ফাউন্ডেশন এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মো. মমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির বাজার ২০৩৪ সাল নাগাদ ১২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর উপস্থাপনায় বাজারটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়।
এই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশ খাদ্য খাত, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩.৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ফ্যাশনপণ্যের বাজার ১.৩১ ট্রিলিয়ন, পর্যটন ১.৩০ ট্রিলিয়ন, ওষুধ ১.২৪ ট্রিলিয়ন এবং প্রসাধনী খাতের বাজার প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। ফলে হালাল অর্থনীতি এখন শুধু খাদ্যপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন শিল্প ও সেবাখাতে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বাংলাদেশের জন্য এই বাজারে প্রবেশের সুযোগও বড়। দেশে প্রায় ৯১ শতাংশ মানুষ মুসলিম হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) সদস্যভুক্ত দেশগুলোতেও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৮০২টি হালাল সনদপ্রাপ্ত পণ্য এবং ৩০১টি নিবন্ধিত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি পৃথক নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। মূল প্রবন্ধে ‘হালাল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব বাংলাদেশ’ গঠনের কথা বলা হয়। তাঁদের মতে, একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকলে হালাল পণ্যের উৎপাদন, সনদায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, কৃষি, প্রবাসী আয় এবং তৈরি পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও এসব খাতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতাও কমছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক হালাল মান নিশ্চিত করে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, এজন্য নতুন করে উৎপাদন অবকাঠামো তৈরির চেয়ে সঠিক সনদায়ন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
হালাল পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম শর্ত হলো গ্রহণযোগ্য সনদ। কোনো পণ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত হালাল মান বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা যাচাই করে সনদ দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সনদায়নব্যবস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং পরীক্ষাগার সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ রয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের হালাল সার্টিফিকেশন বিভাগের প্রধান এ কে এম বদরুল আহসান জানান, ২০০৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি হালাল সনদ দিয়ে আসছে। তবে তাদের নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র পরীক্ষাগার নেই। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষাগার এবং আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুসরণ করে সনদ দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তিনি সব কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পৃথক বিভাগ অথবা একটি হালাল ইনস্টিটিউট গঠনের প্রস্তাব দেন।
এর আগে গত জুলাই মাসেও হালাল পণ্য রপ্তানির প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে আবারও সনদ নিতে হয়। এতে রপ্তানিকারকদের খরচ বাড়ে, পণ্য পাঠাতে দেরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যায়।
প্রাণ গ্রুপের আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও করপোরেটবিষয়ক পরিচালক কামরুজ্জামান কামালও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার ও সনদায়নব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিদেশি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সনদ পেতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে রপ্তানিকারকদের। ফলে একই পণ্যের জন্য একাধিকবার পরীক্ষা ও সনদ সংগ্রহের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে।
শুধু খাদ্যপণ্য নয়, চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও রয়েছে উৎস শনাক্তের সমস্যা। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা চামড়ার উৎস, পশু জবাইয়ের পদ্ধতি এবং উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য চান। কিন্তু বাংলাদেশে পশুর পরিচয়, জবাইয়ের স্থান এবং কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে কারখানায় পৌঁছানো পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় রপ্তানিকারকদের সনদ পেতে জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।
বিনিয়োগের নতুন সুযোগ রয়েছে কৃষি ও খাদ্যপ্রযুক্তিতেও। উন্নতমানের বীজ, অর্গানিক চাল, হালাল কৃষিপণ্য এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি গুদামজাতকরণ, কোল্ড-চেইন সুবিধা, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং বন্দরকেন্দ্রিক পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহার করেও নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। সামুদ্রিক মাছের উপজাত থেকে হালাল জেলাটিন উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, যা খাদ্যপণ্য, ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া মুক্তা ও রত্ন চাষের মতো ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নতুন শিল্প গড়ে ওঠার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়তে পারে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ইসলামি বিনিয়োগব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব এসেছে। মুদারাবা, মুশারাকা ও সুকুকের মতো অর্থায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে হালাল শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ হালাল পণ্যের সনদায়ন, পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রপ্তানি উন্নয়নে পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব সামনে আনে। প্রতিষ্ঠানটি হালাল পণ্যের জন্য পৃথক এইচএস কোড চালু, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তার সুপারিশও করে। তাদের মতে, হালাল পণ্য রপ্তানির প্রকৃত পরিমাণ ও প্রবৃদ্ধি নির্ধারণে আলাদা পণ্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বৈশ্বিক বাজারের আকার নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়। ডিনার স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে সামগ্রিক বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির আকার ৭.৭ ট্রিলিয়ন ডলার বলা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের ২০২৬ সালের আলোচনায় হালাল পণ্যের বাজারের আকার ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হিসাবের মধ্যে বাজারের সংজ্ঞা ও অন্তর্ভুক্ত খাতের পার্থক্য রয়েছে। তাই পুরো ইসলামি অর্থনীতি এবং শুধু হালাল পণ্যের বাজারকে একই পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সামনে বড় বাজার ধরার সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই এই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক মানের সনদ, স্বীকৃত পরীক্ষাগার, পণ্যের উৎস শনাক্তের ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল এবং সমন্বিত নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের জন্য সনদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ করা ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জনও জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হালাল পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।




