দেশের ৪৭.৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত, গ্রামে সংকট সবচেয়ে বেশি
দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারকে সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ঋণ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জীবনযাত্রার মান জরিপ ২০২৫’ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলোকে ঋণ নিতে হচ্ছে বেশি।
জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে বিবিএসের দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল জরিপটি পরিচালনা করে। গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর দেশের গ্রাম, শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকার ১৫০টি নমুনা এলাকা থেকে ৩ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপের ফলাফল ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে।
আয়ের চেয়ে মাসিক ব্যয় বেশি
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ, মাসে গড়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা আয়-ব্যয়ের ঘাটতি থাকছে।
এই ঘাটতি মেটাতে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হচ্ছে। কারও কারও ক্ষেত্রে আগের জমানো সঞ্চয় ভেঙে সংসারের খরচ চালাতে হচ্ছে। ফলে নিয়মিত আয় থাকা সত্ত্বেও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গ্রামে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৫১.৯১ শতাংশ
অঞ্চলভেদে ঋণ নেওয়ার প্রবণতায় বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বিবিএসের জরিপে গত এক বছরে মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার গ্রামাঞ্চলে ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। আর সিটি করপোরেশন এলাকায় হারটি ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।
অর্থাৎ, গ্রামাঞ্চলে অর্ধেকেরও বেশি পরিবার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করেছে। শহরের তুলনায় গ্রামে আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকা এবং কাজের সুযোগের ঘাটতি এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে অর্থনীতিবিদেরা উল্লেখ করেছেন।
শহরে ব্যয় বেশি, গ্রামে ঋণের চাপ বেশি
জরিপে দেখা যায়, সিটি করপোরেশন এলাকার পরিবারগুলোর গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। অন্যান্য শহরাঞ্চলে এই ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
শহরে পরিবারের ব্যয় বেশি হলেও ঋণ নেওয়ার হার গ্রামে বেশি। অর্থাৎ, শুধু ব্যয়ের পরিমাণ নয়, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামাঞ্চলে কাজের সুযোগ ও আয়ের উৎস সীমিত থাকায় অনেক পরিবার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
নিত্যপণ্যের দাম ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধান
জরিপের ফলাফল নিয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার প্রভাব পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপর পড়ছে। তাঁর মতে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কারণে নয়, বরং প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।
বিবিএসের মজুরি হার সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে ছিল। সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা আগের মাসের ৮ দশমিক ০৫ শতাংশের চেয়ে কম। ফলে আয় বাড়লেও পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না অনেক মানুষ।
দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক মন্থরতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে এই হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একই সময়ে আন্তর্জাতিক দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী অতিদারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে এগুলো বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়।
সব মিলিয়ে বিবিএসের জরিপে উঠে আসা চিত্র বলছে, পরিবারের নিয়মিত আয় দিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় সামলানো অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঋণ নেওয়া পরিবারের উচ্চ হার আর্থিক চাপের অসম বণ্টনকে সামনে এনেছে। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভারসাম্য তৈরি না হলে পরিবারগুলোর ঋণনির্ভরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।





