দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের সংখ্যা ও ভ্রমণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপটিতে যেতে পারবেন। দৈনিক গড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন সংশোধিত নির্দেশনায় পুরো পর্যটন মৌসুমে রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে আগের মৌসুমের তুলনায় পর্যটকের দৈনিক সীমা ২ হাজার থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৫০০ হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন মৌসুমের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি।
এই সিদ্ধান্তে দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌযান এবং পর্যটননির্ভর অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয়ের সুযোগ বাড়তে পারে। কিন্তু পর্যটকের বাড়তি চাপ সামলাতে দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
পর্যটক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন
সেন্ট মার্টিনের পর্যটন মৌসুম দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা। পর্যটকেরা গেলে হোটেল ও রিসোর্টে থাকার ব্যবস্থা, খাবার বিক্রি, নৌযান চলাচল, স্থানীয় পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবা থেকে আয় হয়। পর্যটন বন্ধ বা সীমিত থাকলে এসব পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নয় মাসের জন্য দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত বন্ধ ছিল। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের পর এবার ১ নভেম্বর থেকে নতুন মৌসুম শুরুর ঘোষণা আসে। পর্যটন চালুর সিদ্ধান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
১২ অক্টোবর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় পর্যটনের সময়সীমা, দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা, জাহাজ চলাচল এবং দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু তখন জানান, দ্বীপের ধারণক্ষমতা, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক প্রতিবেশের ওপর পর্যটনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
পরে ২৫ অক্টোবর পর্যটক যাতায়াতের নতুন সময়সীমা ও দৈনিক সীমা নির্ধারণ করে নির্দেশনা জারি করা হয়। রাতযাপনের নিয়ম নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হলে ২৭ অক্টোবর সংশোধিত নির্দেশনায় ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াত ও রাতযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ, পর্যটন বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার বিদ্যমান শর্তগুলোও বহাল রয়েছে।
সুপেয় পানির সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
সেন্ট মার্টিনের পরিবেশগত সমস্যার অন্যতম হলো সুপেয় পানির সীমিত প্রাপ্যতা। দ্বীপের বাসিন্দা, হোটেল ও রেস্তোরাঁ এবং পর্যটকদের দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটাতে স্থানীয় উৎসের ওপর চাপ পড়ে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে সেই চাহিদাও বাড়বে।
বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পর্যটনকেন্দ্রিক স্থাপনায় অতিরিক্ত পানির ব্যবহার, অপরিকল্পিতভাবে নলকূপ বসানো এবং ব্যবহৃত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক না থাকলে দ্বীপের পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে শুধু পর্যটকের সংখ্যা নির্ধারণ করলেই হবে না, প্রতিদিন দ্বীপে কত পানি প্রয়োজন, তার কতটুকু নিরাপদ উৎস থেকে পাওয়া যাবে এবং ব্যবহৃত পানি কীভাবে পরিশোধন ও নিষ্কাশন করা হবে, তারও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনায় সুপেয় পানির প্রাপ্যতাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বর্জ্য বাড়লে বিপদে পড়বে দ্বীপের প্রকৃতি
পর্যটন বাড়ার সঙ্গে খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, একবার ব্যবহারযোগ্য পাত্র এবং অন্যান্য বর্জ্যের পরিমাণও বাড়তে পারে। এসব বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা না গেলে তা সৈকত, বসতি ও সামুদ্রিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিন পানিতে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য বিপদ তৈরি করতে পারে। বর্জ্য ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে তা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করতে পারে। ফলে পর্যটনের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা শুধু দ্বীপের সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেরও অংশ।
সরকারের নির্দেশনায় দ্বীপে নিষিদ্ধ পলিথিন বহন বন্ধ করা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং পর্যটকদের নিজস্ব পানির বোতল বা ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি, বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের ওপর।
পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন কত বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, কতটুকু দ্বীপ থেকে সরানো হচ্ছে এবং কতটুকু নিরাপদে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, তার হিসাব নিয়মিত প্রকাশ করা হলে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা শনাক্ত করা সহজ হবে।
প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য কেন ঝুঁকিতে
সেন্ট মার্টিনের পরিচয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে এর প্রবালসমৃদ্ধ সামুদ্রিক পরিবেশ, পাথুরে উপকূল এবং বিচিত্র সামুদ্রিক প্রাণী। এই প্রতিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। পানির গুণগত মানের পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং সামুদ্রিক পরিবেশে মানুষের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রবালপ্রাচীর সামুদ্রিক জীবের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। মাছসহ নানা সামুদ্রিক প্রাণী খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য এই পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রবালের ক্ষতি হলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রজাতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, সামগ্রিক সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রেও পড়তে পারে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিদ্যমান বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে। রাতে সৈকত ও সংলগ্ন এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ এবং সৈকতে মোটরসাইকেল চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি পর্যটকের চলাচল কোথায় সীমিত রাখা দরকার, কোন এলাকায় জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি বেশি এবং পর্যটনের কারণে পরিবেশের কী পরিবর্তন হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক কি দ্বীপের ধারণক্ষমতার মধ্যে?
সরকার দৈনিক গড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের সীমা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু দ্বীপের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা নির্ধারণে শুধু পর্যটকের সংখ্যা বিবেচনা করলেই চলে না। একই সঙ্গে পানি, খাবার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসন, পরিবহন এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর সম্মিলিত চাপ হিসাব করতে হয়।
কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটককে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেই সেই সংখ্যা পরিবেশের জন্য নিরাপদ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ জন্য দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতা, মৌসুমভেদে পরিবেশের পরিবর্তন এবং পর্যটন কার্যক্রমের বাস্তব প্রভাব নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
পরিবেশমন্ত্রীও পর্যটনের সময়সীমা ও দৈনিক সীমা পুনর্বিবেচনার আলোচনায় দ্বীপের ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং সামুদ্রিক প্রতিবেশের ওপর প্রভাব বিবেচনার কথা বলেছেন।
তাই নির্ধারিত পর্যটকসীমা কার্যকর করার পাশাপাশি পর্যটনের কারণে পানি ও বর্জ্যের চাপ কতটা বাড়ছে, সৈকত ও প্রবালের অবস্থা কেমন থাকছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যে কী পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি।
স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য
সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দাদের একটি অংশ পর্যটন ব্যবসা, মাছ ধরা, নৌযান পরিচালনা, খাবার বিক্রি ও অন্যান্য সেবার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে তাঁদের আয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু পর্যটনের কারণে স্থানীয় পানির উৎস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়লে সেই জনগোষ্ঠীকেই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
পরিকল্পিত পর্যটনব্যবস্থায় তাই স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব ব্যবসা পরিচালনা এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় বাসিন্দাদের যুক্ত করা গেলে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পর্যটকদের কাছ থেকে নেওয়া ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেই তথ্যও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। ফি থেকে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পর্যটন থেকে পাওয়া অর্থ দ্বীপ রক্ষার কাজেও ভূমিকা রাখতে পারে।
টেকসই পর্যটনের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি
সেন্ট মার্টিনে পর্যটন চালু রাখার সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দ্বীপের ধারণক্ষমতা ও পানির প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যটকের সংখ্যা নিয়মিত পর্যালোচনা করা। দ্বিতীয়ত, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা।
এ ছাড়া পর্যটন মৌসুমের আগে ও পরে পরিবেশগত অবস্থা যাচাই, স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত গ্রহণ এবং পর্যটকদের জন্য স্পষ্ট আচরণবিধি প্রচার করা দরকার। পরিবেশগত ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
সেন্ট মার্টিনের পর্যটন মৌসুম দীর্ঘ হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ কতটা সুরক্ষিত থাকছে তার ওপর। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোই শেষ কথা নয়, দ্বীপের পরিবেশের সীমা মেনে পর্যটন পরিচালনা করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।








