গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল থেকে বের হওয়া অপরিশোধিত বর্জ্যে একের পর এক খাল ও নদীর পানি কালো হয়ে যাচ্ছে। হায়দরাবাদ খাল দিয়ে আসা বর্জ্য টঙ্গী খালে গিয়ে পরে তুরাগ ও বালু নদীতে মিশছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানির দুর্গন্ধ ও দূষণে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি গাজীপুরের শুকুন্দিবাগ এলাকায় হায়দরাবাদ খাল ঘুরে দেখা যায়, পানির রং কুচকুচে কালো। দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধান অনুযায়ী, টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকার শিল্পাঞ্চল থেকে আসা অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এই খালের দূষণের অন্যতম উৎস।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সমস্যাটি কয়েক বছরের নয়। তাঁদের ভাষ্য, ১৯৯০-এর দশকে গাজীপুরে শিল্পকারখানা দ্রুত বাড়তে শুরু করার পর থেকেই জলাশয়গুলোর অবস্থা বদলাতে থাকে। একসময় খালে মাছ পাওয়া গেলেও এখন সেই সুযোগ নেই; অনেক কৃষিজমিও চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
শুকুন্দিবাগের বাসিন্দা মতিউর রহমানের ভাষ্য, আগে তাঁদের পরিবার ও এলাকার মানুষ খাল থেকে মাছ ধরতেন। এখন পানির দূষণ ও দুর্গন্ধের কারণে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দূষিত পানির প্রভাবে টিনের চাল ও ধাতব জিনিসপত্র দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবেশের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে গবেষণায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় গাজীপুরের বসন শিল্পাঞ্চলের ৩০টি ভূপৃষ্ঠের পানির নমুনা পরীক্ষা করে ক্যাডমিয়াম, সিসা, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে শিশুদের ক্ষেত্রে এসব দূষকের সংস্পর্শে স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে গবেষণার ফল উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গাজীপুরের কিছু এলাকায় পানির পিএইচ ২ থেকে ৪ পর্যন্ত নেমে গেছে। স্বাভাবিক বিশুদ্ধ পানির পিএইচ প্রায় ৭; ফলে এই মাত্রা পানির উচ্চ অম্লতা নির্দেশ করে। একই প্রতিবেদনে অধ্যাপক এ এইচ এম সেলিম রেজার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, কিছু নমুনায় লোহার মাত্রা নিরাপদ সীমার পাঁচ গুণ, সিসা ৩০ গুণ, ক্রোমিয়াম পাঁচ গুণ এবং নিকেল ছয় গুণ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
গাজীপুরের পানি দূষণের চিত্র নিয়ে ২০২৬ সালের আরেকটি গবেষণাতেও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। Scientific Reports-এ প্রকাশিত গবেষণায় গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ওষুধশিল্প-প্রভাবিত তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার পানির ১২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। বেশির ভাগ নমুনায় সিসা, লোহা ও পারদের গড় ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মাত্রা ছাড়িয়েছে এবং গবেষকেরা শিল্পবর্জ্যকে দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শুধু শিল্পকারখানাই অবশ্য দূষণের উৎস নয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক আরেফিন বাদল দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন খাল ও নদীতে অনেক বাড়ির পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও সরাসরি যুক্ত রয়েছে। ফলে শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি অপরিশোধিত গৃহস্থালির বর্জ্যও জলাশয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে।
তবে এত বড় শিল্পাঞ্চল তদারকির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে গাজীপুরে প্রায় ৭ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৬৮৮টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ইটিপি থাকার পরও অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ছাড়ছে বলে অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করেছে দ্য ডেইলি স্টার। এসব প্রতিষ্ঠান নজরদারির দায়িত্বে থাকা স্থানীয় কার্যালয়ে মোট পাঁচজন কর্মী, যার মধ্যে পরিদর্শক মাত্র তিনজন।
আরেফিন বাদলের ভাষ্য, এত বিপুল সংখ্যক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর নজরদারির জন্য বর্তমান জনবল যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, পরিদর্শকের সংখ্যা ৫০ জন হলেও সব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হবে।
তবে জনবল সংকটের মধ্যেও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট ও মনিটরিং শাখা জানিয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তুরাগ দূষণের দায়ে ৪১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৯ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।
গাজীপুরের পানি দূষণের বিষয়টি শুধু স্থানীয় খাল বা নদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ সালের আরেকটি গবেষণায় গাজীপুর জেলার নদী ও পৌর বর্জ্যপানিতে ভারী ধাতু ও ওষুধজাত রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিকেল, সিসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও তামাকে অগ্রাধিকার দূষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটি জলজ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকেও ইঙ্গিত করেছে।
স্থানীয় মানুষের কাছে এর প্রভাব অবশ্য গবেষণার পরিসংখ্যানের চেয়েও সরাসরি। মাছ হারিয়েছে, চাষাবাদ কমেছে, দুর্গন্ধের কারণে ঘরে থাকা কঠিন হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক বাসিন্দা। কেউ কেউ দূষিত এলাকার কারণে সামাজিকভাবেও সমস্যার মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন।
গাজীপুরে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি তাই ক্রমেই সামনে আসছে। শিল্পবর্জ্য শোধন, ইটিপি কার্যকর রাখা, অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা এবং নিয়মিত নজরদারি—সবগুলো ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর না হলে খাল থেকে নদীতে ছড়িয়ে পড়া দূষণ ঠেকানো কঠিন হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে নজরদারির সক্ষমতা নিয়ে। প্রায় ৭ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে মাত্র তিনজন পরিদর্শক দিয়ে নিয়মিত পরিবেশগত তদারকি কতটা সম্ভব, তার সঙ্গে গাজীপুরের জলপথের বর্তমান অবস্থার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।



