বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় রূপান্তর করতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৬৬০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের বড় অংশ এখনো সংস্থান করা যায়নি। ২০২৫ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই খাতে মোট বিনিয়োগ চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৪৮০ কোটি ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। ফলে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে রূপান্তরের পথে অর্থের জোগান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনব্যবস্থায় নিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা না হলে এ রূপান্তর নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে।
পাঁচ বছরে প্রয়োজন ৬৬০ কোটি ডলার
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে প্রায় ৬৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। এর মধ্যে প্রায় ৪৮০ কোটি ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে।
অর্থাৎ মোট প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের বড় অংশের জন্য এখনো অর্থের উৎস নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই অর্থায়ন শুধু বড় কারখানার জন্য নয়, পুরো শিল্প খাতের উৎপাদনব্যবস্থা উন্নত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানার উৎপাদনপ্রক্রিয়া, জ্বালানি ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত সক্ষমতা উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে গবেষণার প্রকাশিত সারসংক্ষেপে প্রতিটি খাতে আলাদা করে কত অর্থ প্রয়োজন, তার বিস্তারিত হিসাব উল্লেখ করা হয়নি।
ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য বেশি চ্যালেঞ্জ
পোশাকশিল্পের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বড় কারখানার তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিনিয়োগ সক্ষমতা সীমিত। ফলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও উৎপাদন অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনতে সহজ শর্তে অর্থায়ন পাওয়া জরুরি।
লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের আলোচনায় ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য সহজ অর্থায়ন এবং সরকারি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, সহনীয় সুদের হার এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা গেলে এসব কারখানার জন্য রূপান্তর প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার প্রশ্ন
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ বিভিন্ন বাজারে পরিবেশগত মানদণ্ড ও টেকসই উৎপাদনের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু উৎপাদন খরচ ও পণ্যের মান নয়, কারখানার পরিবেশগত সক্ষমতাও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বিবেচ্য হয়ে উঠছে। তাই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিক করা কঠিন হতে পারে।
সরকারি সহায়তা ও সহজ অর্থায়নের প্রয়োজন
গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাকশিল্পের সবুজ রূপান্তরের জন্য শুধু উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারের নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন।
সহজ শর্তে ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপনে সহায়তা বাড়ানো গেলে অর্থায়ন ঘাটতি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কারখানার নিজস্ব বিনিয়োগ সক্ষমতা কম, তাদের জন্য আলাদা অর্থায়ন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা, অন্যদিকে উৎপাদনব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করে তোলা। আগামী পাঁচ বছরে প্রয়োজনীয় ৬৬০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের বিপরীতে ৪৮০ কোটি ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি পূরণ করতে না পারলে এই রূপান্তরের গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




