প্রতি একর জমিতে ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ টানছে বেপজা
সীমিত শিল্পজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে প্রতি একরে প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। সংস্থাটির দাবি, এই জমি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি একরে বছরে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক অবদানও তৈরি হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের রপ্তানি আয় সম্প্রসারণে বেপজার শিল্পাঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) চট্টগ্রামে আয়োজিত ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি। এতে চট্টগ্রাম, কর্ণফুলী ও কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং বেপজার দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের শতাধিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী অংশ নেন। বিনিয়োগকারীদের সমস্যা চিহ্নিত করা, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং শিল্প পরিচালনার বাধা দূর করার বিষয়ে অনুষ্ঠানে আলোচনা হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৮.৪১ বিলিয়ন ডলার
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির আওতাধীন শিল্পাঞ্চলগুলো থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৮.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আয় বেড়েছে ২ দশমিক ২২ শতাংশ।
একই অর্থবছরে ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করেছে বেপজা। এসব চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তির আওতায় ঘোষিত বিনিয়োগের পুরো অর্থ কতটা বাস্তবে বিনিয়োগ হয়েছে এবং কতটি কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে, তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন অনুষ্ঠানে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নের মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা শিল্প কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের সমস্যার সমাধান এবং বিনিয়োগ পরিবেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে বেপজা কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সীমিত জমিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে জমির প্রাপ্যতা একটি বড় বিষয়। বিশেষ করে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত জমির চাহিদা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান জমির কার্যকর ব্যবহার করে বেশি বিনিয়োগ ও উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বেপজা।
সংস্থাটির বিনিয়োগ উন্নয়ন বিভাগের সদস্য মো. তানভীর হোসেন অনুষ্ঠানে জমির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বলেন, সীমিত শিল্পজমির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি একরে প্রায় ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি একর জমি থেকে বছরে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক অবদান তৈরির তথ্যও তুলে ধরেন তিনি।
তবে প্রতি একরে বিনিয়োগের পরিমাণ এবং বার্ষিক অর্থনৈতিক অবদান এক বিষয় নয়। বিনিয়োগের অঙ্ক সাধারণত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পুঁজি স্থাপনের পরিমাণ বোঝায়, আর অর্থনৈতিক অবদানের হিসাব নির্ধারণে উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। তাই এই দুই সূচক মূল্যায়নের সময় হিসাবের ভিত্তি ও পদ্ধতি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
জ্বালানি ও অবকাঠামো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
বেপজার শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ বাড়লেও উৎপাদন সচল রাখা এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বাধা কমাতে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং তাঁদের সমস্যা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, বাড়তে পারে পণ্যের খরচ এবং সময়মতো রপ্তানি সরবরাহও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে জমি বরাদ্দ ও বিনিয়োগ চুক্তির পাশাপাশি কার্যকর অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বেপজা নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগও তুলে ধরে। সংস্থাটি জানিয়েছে, যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিল্পায়ন ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এর আগে ১০ অক্টোবর ঢাকায়ও বিনিয়োগকারীদের নিয়ে একই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে বেপজা। সেখানে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষায়িত তিনটি কান্ট্রি ডেস্ক চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করা।
বিনিয়োগের সুফল কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে কতটা
শিল্পজমির কার্যকর ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ দেশের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল মূল্যায়নে শুধু চুক্তির সংখ্যা বা ঘোষিত অর্থের পরিমাণ দেখলে হবে না। কতটি কারখানা উৎপাদনে গেছে, কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, রপ্তানিতে কতটা মূল্য সংযোজন হয়েছে এবং শ্রমিকদের জন্য কী ধরনের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
বেপজা জানিয়েছে, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, শ্রমিককল্যাণমূলক উদ্যোগ, অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ চলছে। এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা বোঝার জন্য বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানির ধারাবাহিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সব মিলিয়ে, সীমিত জমিতে বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে বেপজা। এখন এই বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত বাধা কমানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে এর সুফল বাড়ানোই বড় লক্ষ্য।








