বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে নতুন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করেছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আরও ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় অংশ রাখা হয়েছে সৌরবিদ্যুতের জন্য। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরশক্তি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট নতুন উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে আরও ২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন রোডম্যাপে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় গ্যাসের মজুত ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্পায়ন এবং নগরায়নের সঙ্গে দেশে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে নতুন উৎপাদনক্ষমতা তৈরির পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে পরিকল্পনায় উৎপাদনক্ষমতা যোগ করার লক্ষ্য থাকলেই বাস্তবে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ নিয়মিত পাওয়া যাবে—বিষয়টি এমন নয়। কেন্দ্র নির্মাণ, জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন অবকাঠামো, অর্থায়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়—সবগুলো ধাপের ওপর নির্ভর করবে নতুন সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে।

সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে জমির প্রাপ্যতা, গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার সক্ষমতা এবং উৎপাদনের ওঠানামা বড় বিষয়। দিনের আলো নির্ভর উৎপাদন হওয়ায় সৌরবিদ্যুতের বড় অংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সঞ্চালনব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আলাদা বাস্তবতা রয়েছে। ফলে নতুন কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিকও বিবেচনায় রাখতে হবে।

দেশীয় গ্যাসের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো। বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহের ওপর শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতের চাপ রয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান বা বিদ্যমান ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নতুন রোডম্যাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাস্তবায়নের সময়সূচি। ২০৩০ সালের লক্ষ্য সামনে রেখে একাধিক প্রকল্পকে একই সময়ে এগিয়ে নিতে হবে। এতে বিনিয়োগ, জমি, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি এবং গ্রিড সংযোগ—প্রতিটি পর্যায়ে সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের আলোচনায় তাই শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বা উৎপাদনক্ষমতা নয়, বাস্তবে কতটা বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে—সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা এবং বাস্তব বিদ্যুৎ সরবরাহ এক বিষয় নয়।

সরকারের নতুন পরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎকে বড় জায়গা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কয়লা ও দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরতার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানির ব্যবহার কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য তাই বড় একটি অবকাঠামোগত পরিকল্পনা। এখন এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা যায় কি না এবং নতুন উৎপাদনক্ষমতার সঙ্গে সঞ্চালন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত করা যায়—তার ওপর।