দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এ খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের অনীহা, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ব্যাংকঋণের চাহিদা কমে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের এই প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। টানা সাত মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ধারাবাহিক তথ্যের মধ্যে সেপ্টেম্বরের হার সর্বনিম্ন। ৩ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
টানা সাত মাস ৫ শতাংশের নিচে ঋণপ্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলে তা দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে এবং মে মাসে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়।
এরপর জুনে প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়ায়। জুলাইয়ে ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং আগস্টে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে তা আরও কমে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ কয়েক মাস ধরে ঋণপ্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী রয়েছে। শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকাই নয়, মূল্যস্ফীতির তুলনায়ও ঋণপ্রবৃদ্ধির হার অনেক কম। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ফলে প্রকৃত অর্থে বেসরকারি খাতে ঋণের সম্প্রসারণের চিত্র আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা
ঋণপ্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের অনীহাকে চিহ্নিত করছেন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা।
ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বাজারে চাহিদার দুর্বলতা, জ্বালানির অনিশ্চিত সরবরাহ এবং ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তাঁদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
টিবিএসকে দেওয়া বক্তব্যে সাবেক বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও বাড়বে।
অন্যদিকে ব্যাংকারদের বক্তব্য, অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে নতুন যন্ত্রপাতি কেনা, কারখানার সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রয়োজনও কম অনুভব করছেন উদ্যোক্তারা।
ঋণের সুদ ও জ্বালানি সংকট বড় বাধা
ব্যবসায়িক ঋণের উচ্চ সুদ নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। তবে নীতি সুদহার কমলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। কম সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন কম থাকলে নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও কমে যায়।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, জ্বালানি সংকট, দুর্বল অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা, শিল্পকারখানার কম সক্ষমতা ব্যবহার এবং খেলাপি ঋণের চাপ মিলিয়ে বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি কমেছে।
ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণে সতর্ক
ঋণের চাহিদা কমার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ নীতিতেও সতর্কতা বেড়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে চাইছে না অনেক ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ তখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল।
এ পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা আরও কঠোরভাবে যাচাই করছে।
টিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় অনেক ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে নতুন ঋণ পৌঁছানোর প্রবণতাও সীমিত হচ্ছে।
কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনে কী প্রভাব পড়তে পারে
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে দীর্ঘদিন ঋণপ্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকলে এর প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির গতিও কমে যেতে পারে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রা ও আর্থিক কল্যাণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁর মতে, উচ্চ ঋণব্যয়, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা উদ্যোক্তাদের নতুন প্রকল্প নেওয়া থেকে বিরত রাখছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা ও ঋণের চাপ সামলানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে আস্থা ফেরানোর তাগিদ
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যবসার ব্যয় কমানো, ঋণের সুদ সহনীয় পর্যায়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের ৪ দশমিক ১৭ শতাংশের প্রবৃদ্ধি সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। নতুন প্রকল্প থেকে লাভের সম্ভাবনা, বাজারে পণ্যের চাহিদা এবং ব্যবসা পরিচালনার স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি না হলে ঋণের চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগে দ্রুত গতি ফেরানো কঠিন হবে।



