বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতার পর টানা কয়েক দিন ধরে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংযোগ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শনিবারও ওয়েবসাইটটি চালুর বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে ‘The Service is under Maintenance’ বার্তা দেখা যাচ্ছে। এতে জানানো হয়েছে, সেবাটি রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রয়েছে এবং শিগগিরই আবার চালু করা হবে। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার অর্থ এই নয় যে সেটি ইতিমধ্যে সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সফল হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।

নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে ওয়েবসাইট

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ২৪ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়েবসাইটটি এখনো চালু করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এ নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। তবে ওয়েবসাইটটি কবে নাগাদ সচল হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময় জানাননি।

এর আগে ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে শনাক্ত হওয়া দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

পিএইচপির কোন দুর্বলতা নিয়ে এত উদ্বেগ

পিএইচপি এমন একটি প্রোগ্রামিং ভাষা, যা দিয়ে অসংখ্য ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা পরিচালিত হয়। এ ভাষার মূল ব্যবস্থায় শনাক্ত হওয়া দুটি নিরাপত্তা ত্রুটি ‘PHP2Shell’ নামে পরিচিত। ত্রুটি দুটি হলো CVE-2026-109618 এবং CVE-2026-109619।

বাংলাদেশ সরকারের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্ট ২২ অক্টোবর এ বিষয়ে সতর্কতা প্রকাশ করে। সংস্থাটির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ত্রুটিগুলোর সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারে আগাম অনুমোদন ছাড়াই দূর থেকে ক্ষতিকর কোড চালাতে পারে। এর ফলে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, তথ্য চুরি কিংবা অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পিএইচপি নিরাপত্তা দল ২১ অক্টোবর ত্রুটিগুলো সমাধানে জরুরি নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশ করে। তবে শুধু হালনাগাদ প্রকাশ করলেই ঝুঁকি দূর হয় না। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও সার্ভারে কোন সংস্করণ চলছে, সেটি দুর্বলতার আওতায় পড়ছে কি না এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন কার্যকর হয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

সিঙ্গাপুরের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার ২৩ অক্টোবর হালনাগাদ করা সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, এসব দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। সংস্থাটি ইন্টারনেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সার্ভারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছে।

বাংলাদেশের সাইবার প্রস্তুতি কতটা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। তবে দেশের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, তা নির্ধারণের জন্য শুধু এ সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা পরীক্ষা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, সার্ভারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অনুপ্রবেশের চেষ্টা শনাক্ত করার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারছে। কোনো সফটওয়্যারে নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হলে সেটি কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, কোন সার্ভার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোন ব্যবস্থায় দ্রুত ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব, তা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

বিজিডি ই-গভ সার্টের পরামর্শেও ঝুঁকিপূর্ণ পিএইচপি সংস্করণ শনাক্ত করা এবং দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে আক্রান্ত ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

সরকারি ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবার নিরাপত্তাও একইভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের মূল ওয়েবসাইটের প্রযুক্তি আর তার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এক নাও হতে পারে। ফলে কোনো ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার তথ্য দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ব্যবস্থার নিরাপত্তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

ব্যাংকিং লেনদেনে কি প্রভাব পড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সংযোগ স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে মূল ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও আন্তব্যাংক যোগাযোগ বা আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রথম আলোও ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন স্বাভাবিক থাকার কথা জানিয়েছে।

তবে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, নীতিমালা, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য সেবা ব্যবহার করতে না পারা আলাদা সমস্যা। ওয়েবসাইট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে সাধারণ ব্যবহারকারী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গবেষক ও আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা হতে পারে।

এ কারণে ওয়েবসাইট নিরাপদে চালু করার পাশাপাশি জরুরি তথ্য ও বিজ্ঞপ্তি কীভাবে বিকল্প উপায়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

অতীতের সাইবার হামলার অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি নতুন নয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হিসাবে থাকা অর্থ থেকে হ্যাকাররা প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছিল। ওই ঘটনার পর তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন।

এরপরও বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৩ সালে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু অভ্যন্তরীণ ওয়েবভিত্তিক সেবা ৩৬ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রেখেছিল বলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করা, নিয়মিত দুর্বলতা পরীক্ষা করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

সামনে কী করা জরুরি

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য প্রথম কাজ হলো ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সার্ভারের কার্যক্রমের রেকর্ড পর্যালোচনা করে কোনো অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা বা সন্দেহজনক কার্যক্রমের চিহ্ন রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থার তালিকা তৈরি, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, তথ্যের নিরাপদ ব্যাকআপ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা থাকা দরকার। কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের পরও আগে থেকে কোনো ব্যবস্থা আক্রান্ত হয়ে থাকলে শুধু হালনাগাদ করলেই সেই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। তাই নিরাপত্তা যাচাই ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমানোর একটি পদক্ষেপ। তবে দেশের সাইবার নিরাপত্তা প্রস্তুতির প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় হালনাগাদ সম্পন্ন হয়েছে কি না, কোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা শনাক্ত হয়েছে কি না এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান একই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত, সে বিষয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রয়োজন।

ওয়েবসাইটটি আবার চালু হওয়ার সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেটি নিরাপদে চালু করা হচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত ও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে কি না।