আমানত ফেরত দেওয়া শুরু ন্যাশনাল ব্যাংকের, তহবিল ব্যবহারে ১১ শর্ত

দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট কাটিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ করছে ব্যাংকটি। তবে এই তহবিল ব্যবহারে বাংলাদেশ ব্যাংক ১১টি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান ও সাবেক পরিচালকদের আমানত ফেরত কিংবা নতুন ঋণ বিতরণে এই অর্থ ব্যবহার না করা।

১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার পাশাপাশি আগে টাকা তোলার আবেদন করা গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করে। প্রথম আলো ইংলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট ২০ হাজার কোটি টাকা তোলার আবেদন করেছিলেন।

কী শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্যারান্টির বিপরীতে পাওয়া অর্থ কোনোভাবেই ব্যাংকের বর্তমান বা সাবেক পরিচালকদের আমানত ফেরত দিতে ব্যবহার করা যাবে না। তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বা বিনিয়োগের অর্থ দেওয়াও নিষিদ্ধ।

এ ছাড়া নতুন ঋণ বিতরণ, বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বাড়ানো কিংবা আগে অনুমোদিত ঋণের অবিতরণ করা অংশ ছাড় করতেও এই তহবিল ব্যবহার করা যাবে না। অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ বা বিনিয়োগ কিনে নেওয়া এবং আন্তব্যাংক দায় পরিশোধের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্তে আরও বলা হয়েছে, এই অর্থ দিয়ে নগদ লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না এবং গ্যারান্টির বিপরীতে পাওয়া অর্থ পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ব্যবহার করা যাবে না। তহবিলের ব্যবহার সম্পর্কে প্রতি সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রতিবেদন দিতে হবে ন্যাশনাল ব্যাংককে।

সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে সোনালী ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে তিন মাসের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এই ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশ। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংকটির দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিক করাই এ সহায়তার মূল উদ্দেশ্য।

গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা বজায় রাখা তাদের অগ্রাধিকার।

সব গ্রাহক কি একসঙ্গে টাকা তুলতে পারবেন

ন্যাশনাল ব্যাংক প্রথম ধাপে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের যেসব গ্রাহক টাকা তোলার আবেদন করেছিলেন, তাঁদের অর্থ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্য আমানতকারীদের অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু জাফর প্রথম আলোকে জানান, গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর টাকা তোলার চাপ কিছুটা কমেছে এবং আমদানি কার্যক্রমও বাড়তে শুরু করেছে।

তবে আবেদন করলেই সব গ্রাহক একসঙ্গে পুরো অর্থ হাতে পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যাংক শাখাগুলোতে গ্রাহকদের চাহিদা সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই অর্থ ফেরতের গতি নির্ভর করবে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি এবং পর্যায়ক্রমিক পরিশোধ পরিকল্পনার ওপর।

কেন সংকটে পড়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক

বাংলাদেশের পুরোনো বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ন্যাশনাল ব্যাংক কয়েক বছর ধরে তারল্য সংকট, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের প্রভাব মোকাবিলা করছে। ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি এবং গ্রাহকদের টাকা তুলতে সমস্যার কারণে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়ায় ২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতিও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটাতে খেলাপি ঋণ আদায়, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য উন্নত করা জরুরি।

আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোই বড় পরীক্ষা

ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে পাওয়া তহবিল আমানতকারীদের অর্থ ফেরতে সহায়তা করলেও এই অর্থের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১টি শর্তের মূল লক্ষ্য হলো, সহায়তার অর্থ যেন সাধারণ আমানতকারীদের পাওনা মেটানোর বাইরে অন্য কাজে চলে না যায়। একই সঙ্গে ব্যাংকটিকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে তহবিলের ব্যবহার সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।

গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের কার্যক্রম কত দ্রুত স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছায় এবং ব্যাংকটি নিজের আর্থিক সক্ষমতা কতটা পুনরুদ্ধার করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে ন্যাশনাল ব্যাংকের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।