দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংক চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। এর মধ্যে নয়টি ব্যাংকের মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। বিপরীতে বাকি ২২টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ৩ হাজার ৭০২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রকাশিত আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের এই ফলাফল দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের বৈষম্য তুলে ধরেছে। কয়েকটি ব্যাংক ভালো মুনাফা করলেও দুর্বল ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের লোকসান পুরো খাতের সম্মিলিত ফলাফলকে নেতিবাচক করে দিয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের লোকসান সবচেয়ে বেশি

তৃতীয় প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ৩২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল।

এ ছাড়া এবি ব্যাংক ৮৮০ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ৮৩৮ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ৭২৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে।

রূপালী ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ৩৫৫ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের লোকসান ১৬৯ কোটি টাকা। স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংকও এ প্রান্তিকে লোকসানের মুখে পড়েছে।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম থেকে আয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংকের ঋণ ব্যবসায় লোকসান সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।

মুনাফায় এগিয়ে পুবালী ব্যাংক

লোকসানের বিপরীতে কয়েকটি ব্যাংক ভালো মুনাফা করেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে পুবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছে ৯০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭০ শতাংশ বেশি।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটি মুনাফা করেছে ৬৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সিটি ব্যাংক ৩৪১ কোটি টাকা মুনাফা নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংক ২৩৫ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ২৫১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ১৮২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১৩৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছে।

তবে পুবালী ব্যাংকের মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ব্যাংকটির মূল ঋণ কার্যক্রমে ১৫০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ এবং অন্যান্য আয় থেকে পাওয়া অর্থ সেই ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রেখেছে।

খেলাপি ঋণ ও সংস্থান রাখার চাপ

ব্যাংকগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি। ঋণগ্রহীতারা নির্ধারিত সময়ে ঋণের অর্থ ফেরত না দিলে ব্যাংকগুলো প্রত্যাশিত সুদ আয় করতে পারে না। একই সঙ্গে এসব ঋণের বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী সংস্থান বা প্রভিশন রাখতে হয়।

এই সংস্থান ব্যাংকের মুনাফা থেকে কেটে রাখা হয়। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়লে একদিকে আয় কমে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে বাড়তি অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এতে ব্যাংকের নিট মুনাফা কমে যায়, অনেক ক্ষেত্রে লোকসানও হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ ছিল খেলাপি। মার্চ শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর আয়, মূলধন এবং ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।

ঋণ ব্যবসার বদলে সরকারি সিকিউরিটিজে ঝুঁকছে ব্যাংক

ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় কিছু ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এসব বিনিয়োগ থেকে তুলনামূলক পূর্বানুমানযোগ্য আয় পাওয়া যায়।

পুবালী ব্যাংকের ফলাফলও এ প্রবণতার একটি উদাহরণ। মূল ঋণ কার্যক্রমে লোকসান থাকা সত্ত্বেও সরকারি সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য উৎসের আয় ব্যাংকটির সামগ্রিক মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।

ব্যাংকার ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি, ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর প্রচলিত ঋণ ব্যবসা থেকে আয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

পাঁচ ব্যাংকের লেনদেন স্থগিত

শেয়ারবাজারে মোট ৩৬টি ব্যাংক তালিকাভুক্ত থাকলেও এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার কারণে স্থগিত রয়েছে। ফলে তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফল প্রকাশ করেছে বাকি ৩১টি ব্যাংক।

এই ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে ১৬টির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে, ছয়টির মুনাফা কমেছে এবং নয়টি ব্যাংক লোকসান করেছে।

অন্যদিকে, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের (এনসিসি) মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকটির মুনাফা ৭৭১ শতাংশ বেড়ে ১০৭ কোটি ১৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক এশিয়ার মুনাফা বেড়েছে ৪২০ শতাংশ এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২৫২ শতাংশ।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবি ব্যাংক আগের বছরের লোকসান কাটিয়ে এবার মুনাফায় ফিরেছে।

ব্যাংক খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফল দেখাচ্ছে, দেশের সব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এক রকম নয়। কিছু ব্যাংক ভালো মুনাফা ধরে রাখতে পারলেও বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ ও সংস্থান ঘাটতিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত চাপে পড়ছে।

বিশেষ করে ঋণ আদায় বাড়ানো, পুরোনো খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, আর্থিক অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার এই বৈষম্য কমাতে শুধু মুনাফা বাড়ানো নয়, বরং ঋণের মান উন্নত করা এবং নিয়মিত আদায় নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় কয়েকটি ব্যাংকের বড় অঙ্কের লোকসান পুরো ব্যাংক খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।