দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর বেতার তরঙ্গ নবায়নের খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ জন্য তরঙ্গ নবায়ন ফি ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। তবে প্রস্তাবিত ছাড় যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। সংগঠনটি আরও বেশি ছাড়ের পাশাপাশি তরঙ্গের মূল্য ২০ বছরে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরঙ্গ নবায়নের মূল্য ও পরিশোধ পদ্ধতি নিয়ে বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে নবায়ন ফি
মোবাইল ফোন অপারেটরদের নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সেবা দিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করতে হয়। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে সেই তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি নবায়ন করতে হয়। এর জন্য সরকারকে নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়।
বিটিআরসির প্রস্তাবে তরঙ্গ নবায়নের বিভিন্ন ফি ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর কথা বলা হয়েছে। এতে অপারেটরগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কোন অপারেটরের ক্ষেত্রে কতটুকু ছাড় কার্যকর হবে এবং নবায়নের চূড়ান্ত মূল্য কত দাঁড়াবে, তা নির্ভর করছে প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর।
২০ বছরে কিস্তিতে টাকা দিতে চান অপারেটররা
অ্যামটব বিটিআরসির প্রস্তাবের পাশাপাশি তরঙ্গ নবায়নের অর্থ পরিশোধে আরও নমনীয় ব্যবস্থা চেয়েছে। সংগঠনটির দাবি, তরঙ্গের মূল্য আরও কমানোর পাশাপাশি ২০ বছরে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হোক।
অপারেটরদের যুক্তি, একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হলে ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির ব্যবস্থা থাকলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
সরকারের রাজস্ব কমতে পারে ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা
তরঙ্গ নবায়ন ফি কমানোর প্রস্তাব কার্যকর হলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব প্রায় ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা কমতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে।
এ কারণে বিষয়টি শুধু মোবাইল অপারেটরদের ব্যয় কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও সেবার মান উন্নয়নের বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্বের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
তরঙ্গের মূল্য কমানোর ফলে অপারেটরদের সাশ্রয় হওয়া অর্থ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও গ্রাহকসেবায় কতটা ব্যয় হবে, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গ্রাহকরা কি পাবেন উন্নত নেটওয়ার্ক?
মোবাইল তরঙ্গের মূল্য কমানোর আলোচনায় গ্রাহকদের স্বার্থও গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশে মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ এবং মানসম্মত সেবার চাহিদাও বাড়ছে।
তরঙ্গ ব্যবহারের খরচ কমলে অপারেটরদের ওপর আর্থিক চাপ কমতে পারে। তবে এর সুফল গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে হলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং সেবার মান উন্নয়নে অর্থ ব্যয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নেটওয়ার্কের মান উন্নয়ন, ভবন ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ এবং ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোর বিষয়গুলো গ্রাহকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
বিটিআরসির প্রস্তাব এবং অ্যামটবের অতিরিক্ত ছাড়ের দাবির মধ্যে এখনো সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। তরঙ্গ নবায়নের ফি কতটা কমবে, কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হবে কি না এবং অপারেটরদের কাছ থেকে সেবার মান উন্নয়নে কী ধরনের প্রতিশ্রুতি নেওয়া হবে, এসব বিষয়ই পরবর্তী সিদ্ধান্তে গুরুত্ব পাবে।
তরঙ্গের মূল্য কমানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কার্যকর হলে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় ধরনের আর্থিক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের সুফল গ্রাহকরা উন্নত নেটওয়ার্ক ও মানসম্মত সেবার মাধ্যমে কতটা পাবেন, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।




