কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ বাড়াবে চীন, নজরদারিতে থাকবে ঝুঁকি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উন্নত প্রযুক্তিতে গবেষণা এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে চীন। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এ নির্দেশিকায় এআইকে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাখার জন্য প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ, আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ও দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার যৌথভাবে এ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মৌলিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতে অপরিকল্পিত বিনিয়োগ ও অতিরিক্ত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে।

গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

নতুন নির্দেশিকায় এআইয়ের তাত্ত্বিক গবেষণা, মূল প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত অ্যালগরিদম, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও গণনাশক্তির জোগান শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

শিল্পক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার পরীক্ষামূলকভাবে সম্প্রসারণ করতে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ পরীক্ষাকেন্দ্র বা পাইলট প্রকল্প গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গবেষণাগারে তৈরি প্রযুক্তিকে বাস্তব উৎপাদন ও সেবার কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়াতে চায় বেইজিং।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ২০২৩ সালে ‘নিউ প্রোডাক্টিভ ফোর্সেস’ বা নতুন উৎপাদনশীল শক্তির ধারণাটি সামনে আনেন। এর লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও শিল্পের আধুনিকায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো। নতুন নির্দেশিকাও সেই বৃহত্তর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শিল্পে এআইয়ের ব্যবহার বাড়বে

নির্দেশিকায় ‘এআই প্লাস’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রচলিত শিল্প ও উৎপাদনব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সংযুক্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার এবং মানবসদৃশ রোবটের মতো প্রযুক্তিপণ্যের উন্নয়ন ও ব্যবহার সম্প্রসারণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের লক্ষ্য শুধু এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবন নয়, বরং উৎপাদন ও দৈনন্দিন সেবায় এর ব্যবহার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও দক্ষ করে তোলা।

এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে মৌলিক ও যুগান্তকারী উদ্ভাবন উৎসাহিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে গবেষণা ও শিল্প উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এআইয়ের নিরাপত্তায় নজরদারি ও আগাম সতর্কতা

এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে এর সম্ভাব্য ঝুঁকিও বাড়ছে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ভুল সিদ্ধান্ত, তথ্যের অপব্যবহার, নিরাপত্তার দুর্বলতা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় প্রযুক্তিগত ত্রুটির মতো বিষয় মোকাবিলায় কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।

চীনের নতুন নির্দেশিকায় প্রযুক্তির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। তবে নতুন ব্যবস্থাগুলোর বাস্তব প্রয়োগ, তদারকির বিস্তারিত নিয়ম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।

এআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু প্রযুক্তি তৈরির সময় পরীক্ষা চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি বাজারে আসার পর সেটি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে এবং সমস্যার ক্ষেত্রে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে—এসব বিষয়ও কার্যকর নজরদারির অংশ।

প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান

নির্দেশিকায় প্রযুক্তি খাতে অপরিকল্পিত বিনিয়োগ ও একই ধরনের প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ঢালার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো খাতে সম্ভাবনা দেখা দিলেই পর্যাপ্ত মূল্যায়ন ছাড়া বিপুল বিনিয়োগের প্রবণতা ঠেকাতে চায় চীন।

বিশেষ করে নতুন প্রযুক্তির নামে অন্ধভাবে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি নীতির অপব্যবহার করে প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের নামে অনিয়ম করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

চীনের এ পদক্ষেপের পেছনে অর্থনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ, শুধু অর্থায়ন বা নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বিনিয়োগের বাস্তব ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় চীনের কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে চীন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। উন্নত উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য কৌশলগত প্রযুক্তিতে দেশীয় গবেষণা ও শিল্পের সক্ষমতা শক্তিশালী করা এ প্রচেষ্টার অংশ।

এ প্রেক্ষাপটে নতুন নির্দেশিকা দুটি লক্ষ্যকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে—প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা এবং বিনিয়োগ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা। একই সঙ্গে ড্রোন, উড়ন্ত ট্যাক্সি ও ছোট উড়োজাহাজের মতো স্বল্প উচ্চতায় পরিচালিত প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ও ব্যবসার সুশৃঙ্খল বিকাশের কথাও বলা হয়েছে।

উদ্ভাবন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসা, শিক্ষা, উৎপাদন, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবায় কাজের গতি বাড়াতে পারে। তবে এর ব্যবহার যত বাড়বে, ততই তথ্যের নিরাপত্তা, ভুল সিদ্ধান্তের দায়, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন বাড়বে।

চীনের নতুন নির্দেশিকা এআইয়ের বিকাশকে থামিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে গবেষণা ও শিল্পে এর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছে। তবে নীতিগত ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নজরদারির নিয়ম, জবাবদিহি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের ওপর।

বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা যখন দ্রুত এগোচ্ছে, তখন উদ্ভাবনের সুযোগ ধরে রাখা এবং মানুষের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই নীতিনির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।