কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। চ্যাটবট, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং বড় আকারের তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবহার বাড়ায় ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের প্রয়োজনও দ্রুত বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন বিনিয়োগের দিকে এগোচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪৮৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবহার প্রায় ৯৫০ টেরাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩ শতাংশের সমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভারগুলো প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। পাশাপাশি এসব যন্ত্র সচল রাখতে শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ফলে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা শুধু কম্পিউটার পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

বাড়তি চাহিদার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে, যেখানে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুতের মোট চাহিদা বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকের পেছনে থাকতে পারে ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ।

এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি করছে। একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠান ছোট আকারের মডিউলার পারমাণবিক চুল্লি এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

তবে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ডেটা সেন্টার পর্যন্ত পৌঁছে দিতে প্রয়োজন সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন ও অন্যান্য অবকাঠামোর সম্প্রসারণ। অনেক অঞ্চলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা দ্রুত এগোলেও বিদ্যুৎ সংযোগের সক্ষমতা সেই গতিতে বাড়ছে না।

বিদ্যুতের এই বাড়তি চাহিদা সাধারণ গ্রাহকদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়, বিদ্যুতের দাম এবং স্থানীয় পানি ব্যবহারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি পরিকল্পনায়।

অন্যদিকে, এআই প্রযুক্তি নিজেও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে। বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাস, সঞ্চালন ব্যবস্থার ত্রুটি শনাক্ত এবং উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বিদ্যুতের মোট চাহিদা বছরে গড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এর পেছনে ডেটা সেন্টারের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবহার বৃদ্ধিও ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, নির্ভরযোগ্য সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।