রূপপুরে প্রথম ইউনিটে ফিশন বিক্রিয়া শুরু, অপেক্ষা বিদ্যুৎ সরবরাহের

বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার রূপপুরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১১ অক্টোবর রোববার বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিটে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে রিঅ্যাক্টরটি প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর কমিশনিং দল বিক্রিয়া শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন পরামিতি নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী কাজ করছিল বলেও তিনি জানান।

ফিশন বিক্রিয়া কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

নিউক্লিয়ার ফিশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ইউরেনিয়ামের মতো ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে ছোট নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে তাপ তৈরি করা হয়।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিক্রিয়া শুরু হওয়ার অর্থ হলো, রিঅ্যাক্টরে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপ অর্জিত হয়েছে। তবে এ পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না। উৎপন্ন তাপ কাজে লাগিয়ে বাষ্প তৈরি, টারবাইন চালানো এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে আরও কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।

নিরাপত্তা ভালভের সমস্যার পর অনুমোদন

প্রথম ইউনিটে ফিশন বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ)। ৮ অক্টোবর সংস্থাটি ইউনিটটিকে প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটি পর্যায়ে নেওয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।

এর আগে রিঅ্যাক্টরের স্বয়ংক্রিয় চাপমুক্তকরণ নিরাপত্তা ভালভ—পিওআরভি/পিওএসভি—নিয়ে কারিগরি জটিলতা দেখা দিয়েছিল। ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় কমিশনিং কার্যক্রমে বিলম্ব হয়। পরে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সমস্যাটি সমাধান করা হয় এবং ভালভগুলোর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া যায়।

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ কবে আসবে

ফিশন বিক্রিয়া শুরু হলেও এখনই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হচ্ছে না। রিঅ্যাক্টরের স্থিতিশীলতা, তাপীয় কার্যক্রম, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে বছরের শেষ দিকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সময়সীমা চূড়ান্ত নয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগের আগে আরও দুটি অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

দুই ইউনিটে মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট

পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

কেন্দ্রটিতে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প

প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হয় ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে রিঅ্যাক্টরটিকে চালুর উপযোগী করা হয়। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়, যা ফিশন বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পাওয়ার পথ তৈরি করে।

জ্বালানি খাতে নতুন অধ্যায়ের পথে বাংলাদেশ

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হওয়া দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তবে প্রকল্পটির বাস্তব অবদান নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করা, নির্ধারিত মান বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো এবং জাতীয় গ্রিডে নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর ওপর।

এখন পরবর্তী লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরীক্ষার ধাপগুলো শেষ করে প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা। সেই প্রক্রিয়া সফল হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় পারমাণবিক শক্তির আনুষ্ঠানিক সংযোজন ঘটবে।