প্রয়াত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতার নীতি, বস্তুনিষ্ঠতা ও সাহসিকতায় অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। তিনি বলেছেন, শুধু স্মরণসভা কিংবা স্মৃতিচারণ নয়, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে খালিদীর আদর্শ অনুসরণ করলেই তাঁর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকালে রাজধানীর গুলশান ক্লাবের প্যাটিওতে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর স্মরণসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এ কথা বলেন রামেন্দু মজুমদার। তাঁর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন পেশার মানুষ, সহকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা।

রামেন্দু মজুমদার বলেন, তৌফিক খালিদী সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতার চর্চা করতেন। চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অবস্থানে অটল থাকার যে মানসিকতা তিনি দেখিয়েছেন, তা সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয়।

তিনি আরও বলেন, কোনো চটকদার খবরের পেছনে না ছুটে বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ প্রকাশের চেষ্টা ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই ধারার পেছনে তৌফিক খালিদীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

রামেন্দু মজুমদারের মতে, সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে সাহস নিয়ে কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সত্য ও পেশাগত নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তৌফিক খালিদী নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের দৃঢ়তা দিয়ে সেসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।

স্মরণসভায় উঠে আসে ব্যক্তিজীবনের নানা স্মৃতি

অনুষ্ঠানে শুধু সাংবাদিক হিসেবে নয়, ব্যক্তি তৌফিক খালিদীর জীবন ও সম্পর্কের নানা দিকও উঠে আসে। তাঁর বন্ধু, সহপাঠী, সহকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজরা স্মৃতিচারণ করেন।

স্মরণসভায় বক্তব্য দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি তৌফিক খালিদীর পেশাগত দক্ষতা, মেধা ও সাংবাদিকতায় তাঁর অবদানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও পেশাদার সাংবাদিকতার প্রশ্নে তৌফিক খালিদী নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব আমিনুল ইসলাম খান স্মরণ করেন তৌফিক খালিদীর ছাত্রজীবন ও সাংবাদিক হয়ে ওঠার গল্প। পরিবারের প্রত্যাশা ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে তিনি নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করেছিলেন, সে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান তাজিন আজিজ চৌধুরীও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্মৃতিচারণ করেন। তাঁর ভাষায়, তৌফিক খালিদী শুধু মেধাবী ও দক্ষ মানুষই ছিলেন না, অন্যদের খোঁজখবর রাখতেন এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াতেন।

বন্ধুদের কাছে ছিলেন ভরসার মানুষ

স্মরণসভায় তৌফিক খালিদীর বন্ধুবৎসল স্বভাব এবং বয়সে ছোট-বড় সবার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার গুণের কথাও উঠে আসে।

তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধু ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. কোহিনূর মিয়া বন্ধুকে স্মরণ করে বলেন, মেধা ও চিন্তাভাবনায় তৌফিক খালিদী সব সময় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তাঁকে বন্ধু বলতে তিনি গর্ববোধ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আরেক অনুজ তাজিন আজিজ চৌধুরী জানান, শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তৌফিক খালিদী তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সংকটের সময়ও তাঁর পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যরাও তৌফিক খালিদীর সঙ্গে কাটানো সময়, তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।

লন্ডনে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু

ব্যক্তিগত সফরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে থাকা অবস্থায় গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। তাঁকে সেন্ট বার্থোলোমিউস হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পরদিন, ২ অক্টোবর স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ডিজিটাল সাংবাদিকতার অন্যতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশে বিশ্বাসযোগ্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং পেশাগত স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান সহকর্মীদের স্মৃতিতে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

শুক্রবারের স্মরণসভার শুরুতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়।

স্মরণসভায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কর্মজীবনের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানুষের প্রতি আন্তরিকতাও তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। আর রামেন্দু মজুমদারের আহ্বান অনুযায়ী, তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় হবে সাংবাদিকতার সেই নীতি, সাহস ও বস্তুনিষ্ঠতার চর্চা অব্যাহত রাখা।