মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের তথ্য যাচাই করে আরও নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য নতুন করে আবেদন গ্রহণ বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান জানিয়েছেন, ৭ অক্টোবরের পর আর নতুন আবেদন নেওয়া হবে না।

বুধবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ইতিমধ্যে যারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদন বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির আবেদন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পরপরই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত ছিল। তাই এখন থেকে নতুন আবেদন গ্রহণ না করে আগে জমা পড়া আবেদনগুলো যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মাধ্যমে কমিটি গঠন, তদন্ত ও সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একাধিক ধাপের যাচাই শেষে যাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হবেন, তাঁদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। কোনো আবেদনকারীকে শুধু আবেদন করার ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। মন্ত্রী জানান, এসব অভিযোগের বিষয়ে যাচাই চলছে এবং আগের তালিকা পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে সংসদে তিনি জানিয়েছিলেন, তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করা হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার। তবে চলমান যাচাই-বাছাই শেষে এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ চূড়ান্ত তালিকা তৈরির আগে বর্তমান সংখ্যাকে স্থায়ী হিসেবে দেখছে না সরকার।

শহীদদের তালিকা নিয়েও আলাদা উদ্যোগ রয়েছে। জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হওয়া ৬ হাজার ৭৮৭ জনের নাম ইতোমধ্যে বাংলাদেশ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরির বিষয়েও সরকার কাজ করার কথা জানিয়েছে।

নতুন উদ্যোগে শুধু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার নারীদের তথ্যও সঠিকভাবে সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যেই তালিকা প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ করা হচ্ছে।

এর আগে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল-সংক্রান্ত আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’দের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রেণিভুক্ত করার বিধান যুক্ত হয়েছে। এতে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং দেশ-বিদেশে থেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের আলাদা শ্রেণিতে রাখার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

সরকারের নতুন উদ্যোগের ফলে এখন মূল গুরুত্ব পাচ্ছে আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর যাচাই এবং বিদ্যমান তালিকার সংশোধন। পাশাপাশি শহীদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই করে একটি নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথি তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হবে।