বিরোধী জোটের ‘এক দফা’ আন্দোলনের হুঁশিয়ারির জবাবে বিএনপি বসে থাকবে না বলে জানিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিএনপির অঙ্গ, সহযোগী ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যৌথ সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন রিজভী। তাঁর বক্তব্যের খবর ইউএনবি, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ঢাকা ট্রিবিউনসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বিরোধী পক্ষের ‘এক দফা’ আন্দোলনের প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, এমন হুঁশিয়ারিতে বিএনপি পিছু হটবে না। তাঁর ভাষ্য, জনগণের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত একটি দলকে শুধু হুমকি বা ঘোষণার মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণকে সম্পৃক্ত করে গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে।
রিজভী আরও বলেন, ‘জনগণই মূল বিচারক’ এবং জনগণের সমর্থন রয়েছে—এমন একটি দলের রাজনৈতিক পথ কোনো পরিকল্পিত কর্মসূচি দিয়ে থামানো যাবে না বলে তিনি মনে করেন। এসব বক্তব্য রিজভীর রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে এসেছে।
বিরোধীদের কর্মসূচি নিয়ে আপত্তি কোথায়
একই দিন রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আয়োজিত সমাবেশেও বক্তব্য দেন রিজভী। ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার’ প্রতিবাদে ওই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
সেখানে তিনি বলেন, বিরোধী দল গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করলে বিএনপির আপত্তি নেই। সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচির সুযোগ থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে দেশ অস্থিতিশীল করা বা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তৈরি করা হলে সেই দায় বিরোধী দলকেও নিতে হবে।
রিজভী বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার থাকলেও হুমকি, অপপ্রচার কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে রাজনীতি করা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণের অভিযোগও তোলেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিরোধী পক্ষের পাল্টা বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
১১ দলীয় জোটের লংমার্চ ঘিরে টানাপোড়েন
রিজভীর বক্তব্য এসেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে জোটটি ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে। ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চও করে তারা।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুরমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বলেছিলেন, জোটের আট দফা দাবি যেকোনো সময় এক দফার আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। সেই বক্তব্যের পরই বিএনপির পক্ষ থেকে এক দফার সম্ভাব্য আন্দোলন নিয়ে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া এলো।
তবে বিরোধীদের ধারাবাহিক কর্মসূচির জবাবে বিএনপি এখন পর্যন্ত একই ধরনের পাল্টা লংমার্চ বা রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিএনপির নেতাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দলটি আপাতত সরকার পরিচালনা ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে জোর দিচ্ছে এবং বিরোধীদের কর্মসূচিকে নজরে রাখছে।
জনদুর্ভোগের দায় নিয়ে রিজভীর বক্তব্য
নয়াপল্টনের সমাবেশে রিজভী বলেন, বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিএনপির আপত্তি নেই, কিন্তু সেই কর্মসূচির কারণে দেশের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে বা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তৈরি হলে দায় এড়ানো যাবে না। তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
এর আগে ৪ সেপ্টেম্বরও রিজভী বলেছিলেন, গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মতো বিষয়ে কর্মসূচির পাশাপাশি সমস্যার সমাধানে বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
জ্বালানি সংকট নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
সোমবারের বক্তব্যে রিজভী বিরোধী জোটের লংমার্চের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি জ্বালানি সংকটের মধ্যে বিপুলসংখ্যক গাড়ি নিয়ে লংমার্চ করার সমালোচনা করেন এবং বলেন, সংকটের কারণ ও সমাধান নিয়ে বিরোধীদেরও স্পষ্ট প্রস্তাব দেওয়া উচিত।
রিজভী জ্বালানি সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের ব্যয় ও আমদানি পরিস্থিতি নিয়ে নিজের ব্যাখ্যাও দেন। এসব পরিসংখ্যান ও কারণ তাঁর বক্তব্যের অংশ হিসেবে এসেছে; সরকারি নীতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হিসেবে তা উপস্থাপন করা হয়নি।
সামনে রাজনৈতিক কর্মসূচি
একই ব্রিফিংয়ে রিজভী জানান, সরকার ও বিএনপির বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ এবং পরিকল্পিত সহিংসতার মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগের জবাবে দল ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো কর্মসূচি নেবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হবে সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের পক্ষে জনসম্পৃক্ততা তৈরি করা এবং অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান জানানো।
ফলে ‘এক দফা’ আন্দোলনের হুঁশিয়ারির জবাবে বিএনপির বার্তা আপাতত দুই দিকেই স্পষ্ট—বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার স্বীকার করা এবং একই সঙ্গে কর্মসূচির নামে অস্থিতিশীলতা বা জনদুর্ভোগ তৈরি হলে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে মাঠে থাকার ঘোষণা। পরবর্তী সময়ে বিরোধী জোট কী ধরনের কর্মসূচি নেয় এবং বিএনপি তার জবাবে কী কর্মসূচি ঘোষণা করে, সেটিই এখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।