বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি হ/ত্যা মামলায় তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে তৃতীয় দফায় রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন ঢাকার আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে ৩ নভেম্বর থেকে তিন দিনের দ্বিতীয় দফার রিমান্ডে দীপকে বিভিন্ন কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই করার জন্য তাঁকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ কারণে তৃতীয় দফায় সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
তাহসিফ সাউরি ছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তিনি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মুঠোফোন থেকে তাঁর মায়ের কাছে মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস বার্তা আসে। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি।’ কিন্তু এরপরও তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। পরে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হ/ত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে জেরিকা তাসনিস দিশাও বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন। পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ অক্টোবর রাতে তাঁরা উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যান। এর আগে একই এলাকার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসেও একাধিকবার গিয়েছিলেন। তাঁদের একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে যাওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে। তাহসিফের মুঠোফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, ঘটনার দিন তাহসিফ ও দিশার মধ্যে কোনো কথাকাটাকাটি বা বিরোধ হয়েছিল কি না, কিংবা তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে আগে থেকে কোনো টানাপোড়েন ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি দিশা ও দীপের দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এদিকে একই মামলায় গ্রেপ্তার জেরিকা তাসনিস দিশার দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গত ৪ নভেম্বর চার দিনের প্রথম দফার রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে আরও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ জানিয়েছে, দিশার দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে দীপের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা এবং ঘটনার দিনের চলাফেরা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
এর আগে দীপকে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। পরে ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এবার তৃতীয় দফায় সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। তবে এই নতুন আবেদনের শুনানি শেষে আদালতের আদেশ কী হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় ঠিক কী ঘটেছিল, কোথায় এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, কারা এতে জড়িত এবং ঘটনার পেছনের কারণ কী, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। দীপ ও দিশার জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং অন্যান্য আলামত যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় কারও অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাচ্ছে না।




