বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে ১৫ দেশের ৪০৭ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভারতের নাগরিক ২৩৮ জন। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই ভারতীয় বন্দিদের মধ্যে ১৬৮ জনের সাজা শেষ হলেও প্রত্যাবাসনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়ায় তাঁরা এখনো কারাগারে রয়েছেন। জাতীয়তা যাচাই, সংশ্লিষ্ট দেশের ছাড়পত্র এবং দুই দেশের কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের জটিলতায় তাঁদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া আটকে আছে।

২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার কারা কর্তৃপক্ষ ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কারাগারে থাকা বিদেশি বন্দিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিক। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন মিয়ানমারের নাগরিকেরা।

সাজা শেষ, তবু কেন কারাগারে

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাজা শেষ হওয়া বিদেশি বন্দিদের দেশে ফেরাতে সংশ্লিষ্ট দেশের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা এবং প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া জরুরি। এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের মুক্তি দিয়ে নিজ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।

দ্য ডেইলি স্টারকে কারা অধিদপ্তরের মিডিয়া ও লজিস্টিকস বিভাগের দায়িত্বে থাকা জেলার মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ছাড়পত্র না আসায় বন্দিদের দেশে ফেরানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করছে বলেও তিনি জানান।

কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দিদের নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য ঢাকায় সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সাড়া ও যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় অনেকের প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে।

ভারতীয় হাইকমিশনের হিসাবে বড় পার্থক্য

ভারতীয় বন্দিদের সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষ ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সাজা শেষ হওয়া ভারতীয় বন্দির সংখ্যা ১৬৮। অন্যদিকে, ভারতীয় হাইকমিশনের কনস্যুলার বিভাগের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, তাঁদের হিসাবে সাজা শেষ করে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা মাত্র ২৫ জন ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাজা শেষ হওয়া ভারতীয় বলে চিহ্নিত ১২১ জন বন্দির একটি তালিকা হাইকমিশনে পাঠিয়েছিল। তবে তালিকার অধিকাংশ ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য ভারতীয় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

যেসব বন্দির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি, তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থাটি। কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলেও জাতীয়তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো চলছে বলে হাইকমিশনের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

১৫ দেশের ৪০৭ বিদেশি বন্দি

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারাগারে থাকা ৪০৭ জন বিদেশি নাগরিকের মধ্যে ৪৪ জন সাজাপ্রাপ্ত, ১৯১ জনের মামলা বিচারাধীন এবং ১৭২ জন দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। সাজাপ্রাপ্তদের কারও মৃত্যুদণ্ড হয়নি বলে কারা সূত্র জানিয়েছে।

ভারতীয়দের পর সবচেয়ে বেশি বন্দি রয়েছেন মিয়ানমারের নাগরিক। দেশটির ১৩৩ জন বাংলাদেশের কারাগারে আছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৩ জন সাজাপ্রাপ্ত এবং একজন দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্য বন্দিদের মধ্যে নাইজেরিয়ার ছয়জন, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার তিনজন করে এবং তানজানিয়া ও পেরুর দুজন করে নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া জর্জিয়া, বাহামাস, বেলারুশ, গায়ানা, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও থাইল্যান্ডের একজন করে নাগরিক বাংলাদেশের কারাগারে রয়েছেন।

বিভিন্ন অপরাধে আটক বিদেশি নাগরিক

কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার, মানবপাচার, সোনা চোরাচালান, প্রতারণা, জাল মার্কিন ডলার লেনদেন, পাসপোর্ট-সংক্রান্ত অপরাধ এবং অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে।

নিরাপত্তার কারণে বিদেশি বন্দিদের পৃথক সেলে রাখা হয়। তাঁদের ওয়ার্ডের বাইরের অংশে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হয় বলে কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রত্যাবাসন বিলম্বে বাড়ছে প্রশাসনিক চাপ

সাজা শেষ হওয়ার পরও বিদেশি বন্দিদের দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখতে হওয়ায় ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তাঁদের জন্য কারা ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালু রাখতে হচ্ছে, যা সরকারের ব্যয়ও বাড়াচ্ছে বলে কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ পরিস্থিতিতে বন্দিদের প্রকৃত জাতীয়তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যাঁদের সাজা শেষ হয়েছে, তাঁদের পরিচয় যাচাই ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের কাজ দ্রুত শেষ করতে না পারলে কারাগারে তাঁদের অবস্থান আরও দীর্ঘ হতে পারে।

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১৬৮ ভারতীয় বন্দির সাজা শেষ হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় হাইকমিশনের হিসাবে তাঁদের মধ্যে মাত্র ২৫ জনের নাগরিকত্ব যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। এই ব্যবধান দূর করে বাকি বন্দিদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে প্রধান কাজ।